ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গবেষণাবিমুখ বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়েপড়া বাংলাদেশ

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ
গবেষণাবিমুখ বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়েপড়া বাংলাদেশ

বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় একটি জাতির জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র। এখানেই নতুন ধারণার জন্ম হয়, নতুন প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়, আর এখান থেকেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, গবেষক ও উদ্ভাবক। তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর ইতিহাসে শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শক্তিশালী গবেষণা একে অপরের পরিপূরক। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও গবেষণা সেই অনুপাতে অগ্রসর হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ গবেষণাকে এখনো জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। UNESCO Institute for Statistics-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গবেষণা ও উন্নয়ন (GERD) খাতে ব্যয় দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। ফলে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি, গবেষণা সহকারী, আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার কিংবা পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। অনেক গবেষক ভালো ধারণা থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে গবেষণা সম্পন্ন করতে পারেন না। গবেষণা যখন ব্যক্তিগত সংগ্রামে পরিণত হয়, তখন সেটি আর প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে না। অর্থের সংকটের চেয়েও বড় সংকট আমাদের উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতিতে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষার মূল লক্ষ্য জ্ঞান সৃষ্টি নয়, বরং পরীক্ষায় ভালো ফল ও সনদ অর্জন। শিক্ষার্থীরা নতুন প্রশ্ন তৈরি করার চেয়ে পূর্বনির্ধারিত উত্তর মুখস্থ করতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

গবেষণার জন্য যে কৌতূহল, সমালোচনামূলক চিন্তা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা প্রয়োজন, তা গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত। স্নাতক পর্যায়ে গবেষণার চর্চা দুর্বল থাকায় গবেষণা অনেকের কাছেই উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক শর্ত, জ্ঞান অনুসন্ধানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়।

গবেষণা পিছিয়ে থাকার আরেকটি বড় কারণ শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা পরিচালনা, খাতা মূল্যায়ন, প্রশাসনিক সভা এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। গবেষণার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা- যার ঘাটতি প্রকট। অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণা অনুদান পেতে দীর্ঘসূত্রতা, গবেষণা সরঞ্জাম সংগ্রহে জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা গবেষণার গতি আরও কমিয়ে দেয়। ফলে শিক্ষক গবেষকের চেয়ে প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব পালনে বেশি সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো গবেষণাকে মূল্যায়নের পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার মৌলিকতা, সামাজিক প্রভাব বা বাস্তব প্রয়োগের চেয়ে প্রকাশনার সংখ্যা বেশি গুরুত্ব পায়। এতে মানসম্পন্ন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বদলে দ্রুত প্রকাশযোগ্য গবেষণার প্রবণতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে গবেষণায় স্বচ্ছতা, আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সংস্কৃতিও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠে না। জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে অনেক সময় গবেষণা প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের একটি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দুর্বল সম্পর্কও গবেষণাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকেই নতুন প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং শিল্প উদ্ভাবনের সূচনা হয়। বাংলাদেশে গবেষণার ফল খুব কম ক্ষেত্রেই শিল্পকারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্য কিংবা নীতিনির্ধারণে পৌঁছায়।

ফলে গবেষণা গবেষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার (WIPO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের পেটেন্ট আবেদন ছিল মাত্র ১১৬টি। এই সংখ্যা শুধু উদ্ভাবনের সীমাবদ্ধতাই নয়, গবেষণা ও অর্থনীতির বিচ্ছিন্ন সম্পর্কও তুলে ধরে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে। মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের একটি বড় অংশ উন্নত গবেষণা পরিবেশের খোঁজে বিদেশে চলে যান এবং অনেকেই আর ফিরে আসেন না। অন্যদিকে শিল্পখাত বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়, রাষ্ট্রও কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু কিংবা নগরায়ণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত দেশীয় গবেষণার সহায়তা পায় না। ফলে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করি, কিন্তু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি না; জ্ঞান গ্রহণ করি, কিন্তু জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারি না।

এই বাস্তবতা বদলাতে হলে গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আনুষঙ্গিক কাজ নয়, বরং মূল দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে, আধুনিক গবেষণাগার ও গবেষণা তহবিল গড়ে তুলতে হবে, স্নাতক পর্যায় থেকেই গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য গবেষণার উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলে গবেষণার ফলকে পেটেন্ট, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং নীতিনির্ধারণে রূপ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গবেষণার মূল্যায়নেও সংখ্যার পরিবর্তে মান, মৌলিকত্ব ও সামাজিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী লড়াই অবকাঠামোর পাশাপাশি জ্ঞান ও উদ্ভাবনের।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যত বড় ভবনই নির্মাণ করুক, যদি সেখান থেকে নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন সমাধান সৃষ্টি না হয়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না। গবেষণাসমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ই পারে উদ্ভাবনী শিল্প, দক্ষ মানবসম্পদ এবং প্রমাণভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি গড়ে তুলতে। তাই গবেষণায় বিনিয়োগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত