ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

মো. মুখলেছুর রহমান
এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মহলে একটি পূর্বাভাস বেশ আলোচিত হচ্ছিল- চীন ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। তখন অনেকেই বিষয়টিকে অত্যধিক উচ্চাভিলাষী বলে মনে করলেও সময়ের ব্যবধানে তা যেন সত্যি হতে চলেছে।

আজ থেকে পাঁচ দশক পরের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মানচিত্র আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি প্রজেকশন অনুযায়ী, ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির তালিকায় থাকতে পারে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া। অর্থাৎ অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র পালাবদল করছে। তা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকার দিকে।

এ পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত উত্থান। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ, যা একসময় মাঝারি অবস্থানে ছিল, ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অর্থনীতির এ বড় পুনর্বিন্যাসের মাঝখানে বাংলাদেশও অবস্থান করছে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। গড় বয়স মাত্র ২৬ বছর- যা একটি শক্তিশালী ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই সুযোগ সীমাহীন নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগামী এক-দুই দশকই হবে এই সুবিধা কাজে লাগানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রাকে তুলনা করা হয়েছে একটি ‘প্রথম ধাপের রকেট’-এর সঙ্গে। তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর ভিত্তি করে যে প্রবৃদ্ধি এসেছে, তা নিঃসন্দেহে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এর পরবর্তী ধাপ কী? অর্থনীতিকে টেকসই ও উচ্চ আয়ের পথে নিতে হলে প্রয়োজন দ্বিতীয় ধাপের রূপান্তর। অর্থাৎ স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, উৎপাদনমুখী এবং উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্পের দিকে অগ্রসর হওয়া। অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই রূপান্তর ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় ভালো করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

একসময় দেশটিকে সস্তা শ্রমনির্ভর শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শিল্পনীতির কৌশলগত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা কয়েক দশকের মধ্যেই একটি উন্নত শিল্প অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল পার্থক্য সম্পদে নয়, বরং নীতি ও বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। উন্নয়নকে শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে। পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্র এখানে শুধু নিয়ন্ত্রক নয়, বরং একটি সক্রিয় পরিকল্পনাকারী শক্তি হিসেবেও কাজ করেছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি খুবই স্পষ্ট- দেশটি কি চলমান এশীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হতে পারবে, নাকি দ্রুত পরিবর্তনশীল অঞ্চলের মাঝখানে পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি হিসেবে রয়ে যাবে? এ প্রশ্নের সহজ সরল কোনো উত্তর না পাওয়া না গেলেও এ কথা বহুলাংশে পরিষ্কার-শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শ্রমশক্তির পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং শিল্পায়নের সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ ছাড়া এ রূপান্তর সম্ভব নয়। কারণ অর্থনৈতিক সুযোগ একবার হারিয়ে গেলে তা আবার ফিরে আসার নজির ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

মো. মুখলেছুর রহমান

অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত