ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখনন

মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখনন

‘সবুজ প্রকৃতি আর জালের মতো বিস্তৃত খাল-দিঘি মিলিয়ে অপার্থিব এক আবহ’- যে বরিশালের পরিচয় ছিল এমন রূপময়তায়, তা আজ ভরাট ও দখলের করালগ্রাসে ক্লান্ত এক কংক্রিটের নগরে পরিণত হতে চলেছে। বরিশালের এ রূপান্তর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের খেসারত। একের পর এক খাল বেদখল ও জলাশয় ভরাটের কারণে ঐতিহ্যবাহী এ নদীমাতৃক শহরের অবস্থা এখন রাজধানী ঢাকার মতোই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।

১৫৭ বছরের পুরোনো এ ঐতিহ্যবাহী শহরে একসময় সগৌরবে টিকে ছিল ২৪টি খাল। এখন মাত্র চারটি খালে কোনোমতে পানিপ্রবাহ অবশিষ্ট আছে। বাকিগুলোর মধ্যে সাতটির কোনো অস্তিত্বই নেই এবং ১৩টি প্রায় মৃত। ফলে অল্প বৃষ্টি হলেই ডুবছে বরিশালের অলিগলি। দুঃখজনক বিষয় হলো, খোদ সিটি কর্পোরেশনই ২০০২ সালে দুই লেনের সড়ক করার জন্য ঐতিহাসিক নবগ্রাম খালটি ভরাট করেছিল। আর বর্তমানে টিকে থাকা জেল খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহগুলোর দুই পাড় দখল করে আরসিসি পিলার দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন; ফেলা হচ্ছে বাজারের টন টন বর্জ্য। শুধু খালই নয়, ২০১১ সালের মহাপরিকল্পনায় থাকা ৪৩৬টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুরের অর্ধেকের বেশি আজ গায়েব। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় দেড় হাজার পুকুরের বেশির ভাগই ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এমনকি গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানও শতবর্ষী লালার দিঘি বালু দিয়ে ভরাট করে প্লট তৈরির অন্যায্য উৎসবে মেতেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকা যখন বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্যতাহীন শহরের তালিকায় তলানিতে অবস্থান করছে, তখন বরিশালকে সেই একই আত্মঘাতী ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। খাল ও জলাভূমি হলো একটি শহরের ফুসফুস ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ। এগুলোকে গলাটিপে হত্যা করার কারণে বরিশালের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে এবং শহরের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে।

বরিশালে এখনও যেটুকু স্বস্তি অবশিষ্ট আছে, তাকে রক্ষায় এখনই চূড়ান্ত সময়। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করা যেখানে সম্পূর্ণ বেআইনি, সেখানে কেন প্রশাসন নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে, সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। দখল হওয়া খালের সীমানা মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী চিহ্নিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখনন করে কীর্তনখোলা ও কালিজিরা নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপন করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অবহেলা ও উদাসীনতার জন্যও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাখতে হবে। নয়তো এ শহরকে বাঁচানো যাবে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত