ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নেপালের ত্রিশূলী সুড়ঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার বিজ্ঞান

মমতাজ উদ্দিন আহমদ
নেপালের ত্রিশূলী সুড়ঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার বিজ্ঞান

নেপালের রাসুওয়া জেলায় ত্রিশূলী নদীর তীরে আপার ত্রিশূলি থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে সঞ্জয় সাহা ও কবির মহারজন নামে দুইজন শ্রমিককে ৯ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথম দর্শনে এটি অলৌকিক বলে মনে হতে পারে। ঘটনাটি একই সঙ্গে মানবিক সাহস ও চরম পরিস্থিতিতে মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিস্থাপকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ও নেপালি কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে বরফ, পাথর ও কাদার একটি প্রবল ধ্বংসাবশেষ-প্রবাহ নেমে আসে। এ ঘটনাটি হিমবাহের আংশিক ধসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক কারণ নির্ধারণের জন্য আরও বিশদ তদন্ত প্রয়োজন। প্রবল স্রোত নদী-উপত্যকার বসতি, সড়ক, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর আঘাত হানে। ৪ সেপ্টেম্বর আপার ত্রিশূলি থ্রি-এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই কর্মীকে জীবিত বের করা হয়। তারা হলেন— ৩০ বছর বয়সী যান্ত্রিক ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ এবং ৪৫ বছর বয়সী যান্ত্রিক সুপারভাইজার কবির মহারজন। উদ্ধারকারীরা প্রথমে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর শুনতে পান। পরে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে একজনকে গর্ত দিয়ে ওপরে তোলা হয় এবং অন্যজনকে স্ট্রেচারে করে বের করা হয়। দুজনকেই চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়। ৯ দিন খাবার ছাড়া বেঁচে থাকা কঠিন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একেবারে অসম্ভব নয়। মানুষের শরীর স্বল্পমেয়াদে শক্তির জন্য সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে। পরে চর্বি ভাঙার দিকে যায়। তবে বাস্তব বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় নির্ধারক সাধারণত খাদ্য নয়, পানি, তাপমাত্রা, আঘাত, অক্সিজেন, সংক্রমণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা। সুড়ঙ্গের ভেতরে যদি কোনো অংশ ধ্বংসস্তূপে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে থাকে, সেখানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বাতাসের ফাঁকা অংশ তৈরি হতে পারে। বিবিসির প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এমন একটি সম্ভাব্য গোল্ডিলক্স জোন (উপযুক্ত বাসযোগ্য অঞ্চল)-এর কথা বলেছেন। যেখানে বাতাস, তাপমাত্রা ও পানির অবস্থা সীমিত হলেও কিছু সময় বেঁচে থাকা সম্ভব হতে পারে। এটি একটি সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তবে বিশ্বাসীদের চোখে এটি মহান স্রষ্টার কুদরত। এছাড়া সুড়ঙ্গের প্রকৌশলগত নকশা, বায়ু চলাচলের পথ, জল নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং ধসের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। ধ্বংসাবশেষ যদি সব জায়গা সমানভাবে পূর্ণ না করে, তাহলে কোনো কক্ষ বা নিয়ন্ত্রণকক্ষ তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে। বন্যার প্রধান আঘাত থেকে দূরে এমন একটি ফাঁকা অংশ জীবন রক্ষার সুযোগ তৈরি করে। মানবদেহ খাদ্য ছাড়া কয়েক দিন টিকে থাকতে পারলেও পানিশূন্যতা দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরম, আঘাত, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ও শারীরিক পরিশ্রমে পানি হারানোর হার বাড়ে। বিপরীতে ঠান্ডা, অন্ধকার ও সীমিত নড়াচড়ার পরিবেশে বিপাকীয় চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে সুড়ঙ্গে আটকা পড়া মানুষ নিরাপদে ৯ দিন কাটাতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, পানির প্রাপ্যতা এবং আহত হওয়ার মাত্রা আলাদা। সুতরাং উদ্ধারকৃতদের খাদ্য বা পানি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অনুমানকে নিশ্চিত সত্য বলা যাচ্ছে না।

সঞ্জয় সাহ উদ্ধারকারীদের বলেছেন যে বিপদের সময় তিনি সহকর্মীদের পালাতে বলেছিলেন, কিন্তু নিজে নিয়ন্ত্রণকক্ষে থেকে যান। তিনি সুড়ঙ্গে আটকে থাকার সময় মন্ত্র জপ করেছিলেন এবং কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা বলেছেন। ধর্মীয় প্রার্থনা, মন্ত্র, শ্বাস-নিয়ন্ত্রণ বা কোনো পরিচিত মানসিক অনুশীলন অনেক মানুষের কাছে অনিশ্চয়তার মধ্যে অর্থ ও ছন্দ তৈরি করতে পারে। সঞ্জয়ের অভিজ্ঞতা দেখায় যে সংকটে নেতৃত্ব সব সময় উচ্চপদ বা বাহ্যিক কর্তৃত্বের বিষয় নয়। সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান স্বভাবতই ধীর ও বিপজ্জনক। নতুন ধস, অক্সিজেনের ঘাটতি, পানির চাপ, অস্থির পাথর, অন্ধকার এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা উদ্ধারকারীদের ঝুঁকি বাড়ায়। একটি ভুল পদক্ষেপ জীবিত আটকে থাকা মানুষ এবং উদ্ধারকারী উভয়ের জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাই উদ্ধারকাজে আশাবাদ জরুরি হলেও, পদ্ধতিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও জরুরি। দুই শ্রমিকের উদ্ধার নিঃসন্দেহে আশার সংবাদ। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়। ৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে নেপালে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা বিভিন্ন উৎসে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এ পার্থক্য ঘটেছে গণনা চলমান থাকা, প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহের জটিলতার কারণে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী সম্পদ, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষতি অন্তত ৩৮৭.৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি। প্রায় ২০,০০০ ঘর পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে এবং অন্তত ৭,৫০০ ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে বলে প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুনর্গঠন শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পানীয় জল ও স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্যার পর স্যাটেলাইট রাডার বিশ্লেষণে ত্রিশূলী নদী কিছু স্থানে আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ প্রশস্ত দেখা গেছে। মেঘ ও বৃষ্টির কারণে সাধারণ অপটিক্যাল স্যাটেলাইট ছবি সীমিত হলেও রাডার স্যাটেলাইট ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, আটকে পড়া মানুষের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করা এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ, পাথর, পেরমাফ্রস্ট এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পারস্পরিক সম্পর্ক জটিল। উষ্ণায়ন হিমবাহের স্থিতি ও উচ্চভূমির বরফ-পাথরের কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও নানান কারণে পাহাড় কাটা অব্যাহত আছে। পাহাড়ের মাটি নদীতে গিয়ে এরইমধ্যে বহু নদী নাব্য হারাতে বসেছে। নেপালের বন্যা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ত্রিশূলী-৩ এ উদ্ধার-ঘটনা নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলের জন্য কয়েকটি বাস্তব শিক্ষা সামনে এসেছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি মানচিত্র, সুড়ঙ্গের একাধিক জরুরি বহির্গমনপথ, স্বাধীন যোগাযোগব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং শ্রমিকের অবস্থান শনাক্ত করার ডিজিটালব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা দরকার। প্রতিটি সুড়ঙ্গে বাতাস, পানি, তাপমাত্রা ও কাঠামোগত স্থিতি পর্যবেক্ষণের সেন্সর স্থাপন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নদী অববাহিকাভিত্তিক আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ও আপস্ট্রিম পর্যবেক্ষণ, ড্রোন ও স্যাটেলাইট সমন্বয়, স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ এবং সীমান্তপারের তথ্য-বিনিময় বাড়ানো দরকার।

লেখক : সাংবাদিক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত