ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান

বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন স্বর্ণ চোরাচালানের একটি অবাধ ও নিরাপদ করিডরে পরিণত হয়েছে। একের পর এক অভিযান আর হাজার হাজার কিলোগ্রাম স্বর্ণ জব্দের খতিয়ানকে আপাতদৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা মনে হলেও মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক দুর্বল দিক।

গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার কেজি স্বর্ণ উদ্ধার কিংবা পাঁচ শতাধিক মামলার যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট-আকাশপথে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধ হওয়া দূরে থাক, তা দিন দিন আরও বিস্তৃত ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিদেশের মাটিতে বসে মাফিয়ারা ছক কষছে, আর দেশের ভেতরে অনায়াসে ঢুকছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ চালান। অথচ প্রতিবারই শুধু ধরা পড়ছে কিছু ভাড়াটে বাহক, আর পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থাকা সিন্ডিকেটের মূল হোতারা বরাবরের মতোই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক যে বিমানবন্দরের ভেতরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতাতেই ডালপালা মেলছে- একথা আজ আর কারও অজানা নয়। কিন্তু পাচারের এসব পদ্ধতি বহু পুরোনো হলেও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না, তা এক বড় প্রশ্ন। কীভাবে বা কী কী পন্থায় স্বর্ণ চোরাচালান করা হয়-সব পথ ও কৌশল কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তা সত্ত্বেও যুগের পর যুগ ধরে একই নাটকের পুনরাবৃত্তি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্ক্যানিং প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির চরম গাফিলতিকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। প্রতিদিন হাজারো সাধারণ যাত্রী যেখানে কড়াকড়ির শিকার হন, সেখানে শত শত কেজির স্বর্ণ কীভাবে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল গলে বাইরে বেরিয়ে যায়, এ প্রশ্নের ভেতরেই রয়েছে উত্তর।

আমরা মনে করি, শুধু চুনোপুঁটি বা বাহক ধরে সাফল্যের তথ্য প্রচার করলে হবে না; উপড়ে ফেলতে হবে মূল বিষবৃক্ষ। কাস্টমস, সিভিল এভিয়েশন, বিমানবন্দর পুলিশ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কায়িক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব সংস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা কালো হাতগুলোকে আগে চিহ্নিত করতে হবে। বিমানবন্দরের সংবেদনশীল পদে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর বাধ্যতামূলক রোটেশন বা বদলির নিয়ম কার্যকর করাও জরুরি। একইসঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ। দরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বডি স্ক্যানার, লাগেজ এক্স-রে প্রযুক্তি। অভ্যন্তরীণ আগমনী টার্মিনালেও দরকার আন্তর্জাতিক মানের সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা। পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে অবস্থানকারী যেসব মাফিয়া ডনের নাম গোয়েন্দা তালিকায় উঠেছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে ইন্টারপোলের সহায়তায় আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

ভুলে গেলে চলবে না, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারকে যদি এভাবে অপরাধীদের অভয়ারণ্য ও চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য হতে দেওয়া হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা, রাজস্ব আয় এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে চোরাচালানের মূল সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলতে সব পক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত