প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতি বদলে দিতে পারবে, নাকি এটা শুধু ধনী দেশগুলোর বিলাসিতা? বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার উত্তরটা চমকে দেওয়ার মতো।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিলে যে অগ্রগতি সাধারণত একশ বছরে হয়, তা মাত্র ১০ বছরে অর্জন করা সম্ভব। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, এর পেছনে বাস্তব সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের সামনেও এই সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেছেন, এআই উন্নয়নশীল অর্থনীতির সামনে একটা সুযোগ এনে দিয়েছে, আর এই সুযোগ লুফে নেওয়া দরকার। কথাটা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি। বিশ্ব বাণিজ্য এখন শুল্ক যুদ্ধ আর সরবরাহ শৃঙ্খলের টানাপোড়েনে নড়বড়ে। এর মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিস্ফোরক চাহিদায় ভর করে চীনের মতো দেশ রপ্তানিতে বড় সাফল্য দেখাচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে দেশটির কম্পিউটার আর ডেটা প্রসেসিং যন্ত্রাংশের রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৪৫ শতাংশের বেশি। এই একটা পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, এআই আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে এখন রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান আর জাতীয় প্রবৃদ্ধিও জড়িয়ে যাচ্ছে।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই চাকরি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে। তবে এখানেই বাংলাদেশের জন্য একটা স্বস্তির খবর আছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় এই ঝুঁকি মাত্র সাড়ে চার শতাংশ অর্থাৎ ধনী দেশের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। এর একটি কারণ হলো, আমাদের অর্থনীতির বড় অংশ এখনও হাতে-কলমে কাজনির্ভর। কৃষক মাঠে লাঙল চালান, রিকশাচালক অলিগলি চেনেন নিজের হাতের রেখার মতো, দর্জি হাতে সেলাই করেন। এই কাজগুলো কম্পিউটার প্রোগ্রাম রাতারাতি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
উল্টো দিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ১৬ শতাংশ চাকরিতে এআই মানুষের কাজকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করে তুলতে পারে, যা উন্নত দেশের সম্ভাবনার প্রায় সমান। তাই বাংলাদেশের মতো দেশে এআই কাজ কেড়ে নেওয়ার চেয়ে কাজকে সহজ করার সুযোগই বেশি তৈরি করতে পারে।
কৃষি খাতের কথা ধরা যাক। রাজশাহীর আশপাশের এলাকায় এখন কিছু কৃষক মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সেচের সময় ঠিক করছেন, কেউ আবার ফসলের পাতার ছবি তুলে রোগ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। এখনো এর ব্যবহার সীমিত পরিসরে। তবে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে কৃষিতে এর প্রভাব বড় হতে পারে।
ভারতে স্থানীয় ভাষায় তৈরি স্বল্প খরচের এআই টুল এরইমধ্যে লাখো কৃষককে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশে একই মডেল প্রয়োগ করলে সার ও পানির অপচয় কমবে, ফলন বাড়বে, কৃষকের হাতে বাড়তি আয় আসবে। স্বাস্থ্য খাতেও একই সুবিধা মিলতে পারে।
দেশের বহু গ্রামে এখনো একজন যোগ্য চিকিৎসক পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিতে হয়। প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ে এআই সহায়তা করলে শহরে না গিয়েও মানুষ দ্রুত পরামর্শ পাবে, সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে।
শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জটা একটু ভিন্ন। অনেক স্কুলে শিক্ষক নেই, থাকলেও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি আছে।
এআইচালিত ডিজিটাল সহায়ক এই ফাঁক কিছুটা পূরণ করতে পারে। তবে এর পথে একটি বড় সমস্যা আছে, বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার নেই।
বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট করে বলেছে, স্থানীয় ভাষার তথ্য না থাকলে কোনো দেশ এআইয়ের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারবে না। এই কাজ সরকার একা করতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সমন্বয় দরকার, নইলে প্রযুক্তি হাতের কাছে থাকলেও তার ফল আমরা ঘরে তুলতে পারব না। এই সুযোগ অবশ্য নিজে থেকেই কাজে লাগবে না। বিশ্বব্যাংক কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা আর দক্ষ জনবল ছাড়া এআই বৈষম্য কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিটিআরসির সবশেষ তথ্য বলছে, দেশে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি, মোবাইল সংযোগ প্রায় ১৯ কোটি। সংখ্যাটা দেখতে বড়, কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেটের বাইরে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে ১০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯১ নম্বরে, আর ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গতিতে ১৪০টি দেশের মধ্যে ৯৩ নম্বরে। ইন্টারনেটের গতি না বাড়লে এআইয়ের সুবিধা অনেকটাই কাগজে-কলমে থেকে যাবে। সরকারি সেবার জায়গাটাও উল্লেখ করা দরকার। কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে এআই কাজকে দ্রুত ও নির্ভুল করতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি কর ফাঁকি শনাক্তকরণে এআই ব্যবহার করে, রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা রাজস্ব ঘাটতিতে ভোগা আমাদের অর্থনীতির জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়।
ব্যাংকিং খাতেই এর একটা বাস্তব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। এই খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও গ্রাহকসেবায় এআইয়ের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগে যে কাজের জন্য অনেক সময় ও জনবল লাগত, সেখানে এখন তথ্য বিশ্লেষণ কয়েক মিনিটেই সম্ভব হচ্ছে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতেও এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথাগত ব্যাংকিং ইতিহাস নেই বলে যারা ঋণ পান না, তাদের জন্য বিকল্প তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, আর তা সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ কি তাহলে এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে? এখনও তা বলা যাবে না। বিশ্বব্যাংক নিজেই বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো বিশাল ডেটা সেন্টার বা বড় ভাষাভিত্তিক মডেল তৈরি করার দরকার নেই। এই প্রতিযোগিতায় কে সবচেয়ে বড় মডেল বানাল সেটা মুখ্য নয়, কে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে সবচেয়ে দ্রুত কাজে লাগানোর ভিত্তি তৈরি করতে পারল সেটাই আসল কথা। আগে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ, এরপর স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা অভিযোজন, আর দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি, বাংলাদেশের জন্য এই তিন ধাপের পথই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
তবে শুধু এআই নিয়ে কথা বললে হবে না। আগে ঠিক করতে হবে কোথায় এটি ব্যবহার করলে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট অবকাঠামো মজবুত করতে হবে, বাংলা ভাষার ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে, দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে, আর দরকার বাস্তবসম্মত প্রযুক্তিবান্ধব নীতিমালা। যে দেশ আজ এই ভিত্তি তৈরি করে ফেলবে, আগামী দশকে তার অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। দেরি করলে যে সুযোগ আজ হাতের নাগালে আছে, তা একসময় শুধু দূরের স্বপ্নই থেকে যাবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক