ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ধারা

জুবায়ের রহমান চৌধুরী
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ধারা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভোট আছে। একাধিক প্রার্থীও থাকতে পারেন। ব্যালট বাক্স থাকবে, ভোট গণনা হবে, ফলও ঘোষণা করা হবে। বাইরে থেকে দেখলে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের প্রায় সব উপাদানই সেখানে উপস্থিত। কিন্তু একজন সংসদ সদস্য নিজের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এ ভোটে তার স্বাধীন পছন্দটি আসলে কোথায়?

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না। দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে যদি কোনো ব্যক্তি সংসদণ্ডসদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হবে। তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদণ্ডসদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না। বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর উত্তরটি বেশ কঠিন। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হবেন।

অন্যদিকে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’ দিলে তার আসন শূন্য হবে। অর্থাৎ দলীয় টিকিটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতার ওপর সংবিধানেই একটি বড় সীমা আরোপ করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গোপন ভোটের নির্বাচন বানায়নি; বরং স্পষ্টভাবে ‘প্রকাশ্য ভোটের’ কথা বলেছে। ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে ভোটার সংসদ সদস্যের নাম ও বিভক্তি নম্বর থাকে। যে প্রার্থীকে তিনি ভোট দেন, তার নামের বিপরীতে সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করতে হয়। ফলে কোন সংসদ সদস্য কাকে ভোট দিয়েছেন, সেটি গোপন রাখার জন্য এ পদ্ধতি তৈরি হয়নি। তবে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আসন হারাবেন কি না- তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে নিষ্পত্তির জন্য যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের প্রশ্নটি নতুনও নয়। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন প্রণয়নের পর প্রকাশ্য ভোটের বিধান আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন একাধিক সংসদ সদস্য। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, প্রকাশ্য ভোটের কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদের প্রভাব পড়বে এবং সংসদ সদস্যরা স্বাধীন বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি বেছে নিতে পারবেন না।

সেই মামলায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের প্রকাশ্য ভোটের বিধান বহাল রাখেন আদালত। সংসদ সদস্যকে দলীয় প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে দেখার যুক্তি গ্রহণ করেনি। ফলে বর্তমান আইনি কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা কার্যকর থাকবে, এমন ব্যাখ্যা মোটেই হঠাৎ আবিষ্কৃত কোনো ধারণা নয়।

১৯৯১ সাল থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্যে এ বিতর্কটি রয়ে গেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের সংখ্যাই যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল কার্যত ঠিক করে দেয়, নির্বাচন করার প্রয়োজন কী? আইনের দৃষ্টিতে নির্বাচন করতেই হবে, যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পর মাত্র একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে সরাসরি নির্বাচিত ঘোষণা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু দুই বা ততোধিক প্রার্থী থাকলে ভোটের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী নিশ্চিতভাবে জিতবেন বলে ধরে নিয়ে নির্বাচন কমিশন তাকে আগেই রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করতে পারে না।

আইন সম্ভাব্য ফল নয়, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বলে। এই অর্থে নির্বাচনটি ‘অপ্রয়োজনীয়’ নয়। কারণ রাষ্ট্রপতির বৈধতা কোনো রাজনৈতিক দলের আসনসংখ্যা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না; সংবিধান ও আইন নির্ধারিত নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকেই আসে।

বর্তমান সংসদে বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংসদ সদস্যের সংখ্যা বর্তমানে ৩৪৯। ফলে দলীয় ভোট অটুট থাকলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অনুমানযোগ্য।

আর যদি ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটেও প্রয়োগ করা হয় এবং ভোট প্রকাশ্য হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কোনো সংসদ সদস্যের পক্ষে বিরোধী প্রার্থীকে সমর্থন করা শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়, নিজের সংসদ সদস্যপদ নিয়েও ঝুঁকি নেওয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেখানেই ‘নির্বাচন’ ও ‘বাছাই’-এর পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার যেহেতু সাধারণ নাগরিক নন, সংসদ সদস্য, তাদের ওপর দলীয় শৃঙ্খলা থাকা অস্বাভাবিক নয়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকার টিকিয়ে রাখা, বাজেট পাস করা বা গুরুত্বপূর্ণ আইন অনুমোদনে দলীয় শৃঙ্খলার যৌক্তিকতা রয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি কোনো দলের সংসদীয় নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। বাংলাদেশের সংবিধানে তার অধিকাংশ কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সম্পাদিত হলেও পদটির সাংবিধানিক মর্যাদা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যকে একই দলীয় বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখা উচিত কি না, সেই প্রশ্ন বহু পুরোনো।

আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে ভোটের আগেই ফলাফল নিয়ে কোনো সাসপেন্স নেই। সংসদে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- ফলাফল যদি জানাই থাকে এবং সংসদ সদস্যরা যদি দলীয় প্রার্থীর বাইরে কাউকে ভোট দেওয়ার অধিকারই না রাখেন, তবে এত আয়োজন করে নির্বাচনের আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কি?

ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ‘এমনিতেই’ কাউকে জয়ী ঘোষণার সুযোগ সংবিধানে নেই। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার অধিকার রয়েছে। বিরোধী জোট প্রার্থী ঘোষণা করায় এখন আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সুযোগ নেই। নির্বাচন না করলে বিরোধী দলের সেই সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়।

ভোটগ্রহণ ছাড়া কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলে সেটি আইনিভাবে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ তার আইনি বৈধতাও হারাবে।

এ নির্বাচন আসলে বাংলাদেশের সংসদীয় কাঠামোর একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে নিজেদের বিবেক বা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে ভোট দিতে পারেন না। দল যাকে মনোনীত করবে, তাকেই ভোট দিতে তারা বাধ্য।

ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি একটি নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং নির্বাহী বিভাগ কার্যত একীভূত। এখানে সংসদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, তারা কেবল দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে কাজ করে।

ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হলেও নির্বাচনটি অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং এটি সাংবিধানিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। তবে ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর প্রয়োগের সতর্কবার্তা এটিই স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় দলের ভেতরের শৃঙ্খলার নামে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খানিকটা দমিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাচন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর নেই।

জুবায়ের রহমান চৌধুরী

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত