প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৯৭৮ সালের আজকের দিনে (১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেননি; বরং রাষ্ট্রদর্শন, জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে একটি সুসমন্বিত কাঠামোগত সম্পর্ক স্থাপন করেন। তার প্রবর্তিত 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' ছিল এই রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, নাগরিকত্ব, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বহুত্ববাদ এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার সমন্বয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে শুধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন কিংবা চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের দিকে কূটনৈতিক সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার পূর্ণ তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না।
তার পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর ছিল- একক কোনো শক্তিবলয়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে কৌশলগত বহুমুখীকরণ (Strategic Diversification), বহুপাক্ষিক ভারসাম্য (Multilateral Balancing) এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনা। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এক খাঁটি ভূমিপুত্র ও মাটির সন্তান, যার দেশপ্রেম ও সৎ-মহৎ নেতৃত্বের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান এবং রণক্ষেত্রে সম্মুখ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মাটির গন্ধ ও মানুষের নাড়ির স্পন্দন গভীরভাবে অনুধাবন করেই তিনি দল ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এক দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল কূটনীতি হিসেবে স্বীকৃত। তার দক্ষ ও বাস্তববাদী নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পরাশক্তির দাসত্ব এড়িয়ে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার উন্মোচন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ঐতিহাসিক বিজয় এবং সার্কের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে এক অনন্য আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও নাগরিক পরিচয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। তিনি ভাষা ও সংস্কৃতির মৌলিক ভূমিকাকে অস্বীকার না করে এর সঙ্গে ভূখণ্ড, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, বহুধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং একটি অভিন্ন রাজনৈতিক নিয়তিকে যুক্ত করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্কাস ফ্রান্ডা (Marcus Franda) তার Ziaur Rahman and Bangladeshi Nationalism প্রবন্ধে দেখিয়েছেন- কীভাবে জিয়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংহতি ও বহির্বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তা রক্ষার তাগিদে এই ধারণার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
জিয়ার জাতীয়তাবাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে এমন এক ভূ-কৌশলগত ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে দেশটি কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির বলয়ে বা ছায়ায় সীমাবদ্ধ না পড়ে। এই সার্বভৌমত্ববোধ তার পররাষ্ট্রনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। সংবিধানে ঘোষিত 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'- এই মূলনীতিকে তিনি বাস্তববাদী কূটনীতি (Realpolitik)-র আলোকে প্রয়োগ করেন। তার কাছে বন্ধুত্বের অর্থ ছিল না কোনো একক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের ওপর একমুখী নির্ভরতা; বরং সার্বভৌম সমতা (Sovereign Equality), পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তখন বিশ্বরাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক (Cold War Bipolarity) কাঠামোয় আবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (১৯৭১), পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতা এবং চীন-পাকিস্তান অক্ষ বাংলাদেশকে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে দাঁড় করায়। এই বাস্তবতায় কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুসারী না হয়ে তিনি বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পশ্চিম ইউরোপ, চীন, জাপান, মুসলিম বিশ্ব ও আসিয়ানের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ তার নীতির অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) ও গ্রুপ অব ৭৭ (এ-৭৭)-এর সক্রিয় প্ল্যাটফর্মে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অধিকারের পক্ষে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নেন।
বাংলাদেশ ও গণচীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর। তবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই সম্পর্ক অত্যন্ত দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক চীন সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপক অগ্রগতি হয়। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং বৈদেশিক প্রতিরক্ষায় একক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে সহায়তা করে। জাপানের সঙ্গেও উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার করা হয়।
১৯৭৮ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি জাপানকে পরাজিত করে বাংলাদেশের এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বিজয় অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকার সফট পাওয়ার ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৯৭৯-১৯৮০ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন ছিল সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি। স্বাধীনতা অর্জনের এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিশ্বরাজনীতির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামে বাংলাদেশ নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করে: ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের দৃঢ় ও স্পষ্ট ভোটাভুটি বিশ্বমঞ্চে সার্বভৌম অখণ্ডতার পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ফোরামে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে বাংলাদেশ নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন জানায় এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের ঐক্য জোরদার করে।
১৯৭৪ সালে লাহোর শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ ওআইসির সদস্যপদ লাভ করলেও জিয়াউর রহমানের আমলে সংগঠনটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে উন্নীত হয়: ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (IsDB) সদস্যপদ গ্রহণ করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক তহবিল থেকে সরাসরি বাংলাদেশের কৃষি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান আসার পথ উন্মুক্ত হয়।
১৯৭৬ সালে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইরাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। এই নীতিই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দেয়। জিয়াউর রহমান ওআইসির আল-কুদস কমিটির সদস্য হিসেবে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবদান রাখেন। ১৯৮০ সালে রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে ওআইসির নয় সদস্যের 'ইসলামিক পিস কমিটি'র সদস্য মনোনীত হয়ে তিনি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সংঘাত নিরসনে সরাসরি তেহরান ও বাগদাদে মধ্যস্থতামূলক শান্তি মিশনে অংশ নেন। ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর ওআইসির আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় এই শান্তি প্রচেষ্টায় তার ভূমিকার গভীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC)-এর প্রস্তাবনা। দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক বৈরিতা, দ্বিপাক্ষিক অবিশ্বাস ও সীমান্ত সংঘাতের বাস্তবতা অনুধাবন করে তিনি উপলব্ধি করেন যে রাজনৈতিক বিরোধ একপাশে রেখে দারিদ্র্য, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, কৃষি ও বাণিজ্যের মতো সাধারণ সমস্যাগুলো বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাধানযোগ্য। ১৯৮০ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সরকার প্রধানদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি ও কার্যপত্র পাঠিয়ে দক্ষিণ এশীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা কাঠামো গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সচিব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সার্কের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়াসহ আন্তর্জাতিক গবেষণায় জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের রূপরেখাকেই সার্কের প্রথম ও মূল রাষ্ট্রীয় ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক প্রটোকল বা রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এক উন্নয়নমুখী কূটনীতি (Development Diplomacy)। তিনি বিশ্বাস করতেন- একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি টেকসই হয় না। আবার বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নতুন বাজার উন্মোচন ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন অসম্ভব। তাই অভ্যন্তরীণ কৃষি বিপ্লব, খাল খনন কর্মসূচি, শিল্পায়ন ও গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি পশ্চিমা দেশগুলো (যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ), এশীয় পরাশক্তি (চীন, জাপান) এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সাহায্য ও বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
ঐতিহাসিক ও কাঠামোগতভাবে, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ, মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্সের ভিত্তি স্থাপন এবং নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি প্রবর্তনের মতো মৌলিক আর্থসামাজিক রূপান্তরে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে।
জিয়াউর রহমানের সূচিত পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয়তাবাদী দর্শনের ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার 'লুক ইস্ট পলিসি', অর্থনৈতিক কূটনীতির সম্প্রসারণ এবং সার্ককে কার্যকর রাখার কূটনৈতিক পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়; আর সমকালীন জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় তার উত্তরসূরি তারেক রহমান দলটির ঘোষিত 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' (Bangladesh First) নীতির আলোকে জাতীয় স্বার্থ ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য, আধুনিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সুসংহত করার কৌশল পরিচালনা করছেন।
বস্তুত জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' এবং তার 'ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক' ছিল পরস্পরের পরিপূরক। তার নীতি বিচ্ছিন্নতাবাদী বা অতি-সংকীর্ণ ছিল না; বরং তা ছিল সার্বভৌম সমতা, আত্মমর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিশ্বসম্প্রদায়ের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার প্রয়াস। তার মূল বার্তা ছিল: একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও বিচক্ষণ কূটনীতি, সক্রিয় বহুপাক্ষিক ভারসাম্য এবং সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থানের মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত কার্যকর ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারে। সমকালীন বহুমেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের এই বহুমুখী ভারসাম্য ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন কূটনীতি আজও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়কোচিত রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।