প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আত্মহত্যাকে আমরা খুব সহজেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে চালিয়ে দিই। যেন এটি ব্যক্তির দুর্বলতা, মানসিক অক্ষমতা কিংবা ব্যর্থতার ফল। অথচ বাস্তবতা এতটা সরল নয়। একজন মানুষ এমন সংকটে পৌঁছানোর আগে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, অবহেলা, একাকিত্ব, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা নানা ধরনের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে পারে।
তাই একটি মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর পেছনের অনেক বাস্তব কারণই অদৃশ্য থেকে যায়।
অনেক সময় মানুষ জীবনকে নয় বরং অসহনীয় হয়ে ওঠা পরিস্থিতিকে শেষ করতে চায়। রেজাল্টের চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা সমাজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তুলনা-সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষ নিজেকে ব্যর্থ বা বোঝা মনে করতে শুরু করতে পারে। তখন তার কাছে ভবিষ্যৎও অন্ধকার মনে হতে পারে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। একটি পরীক্ষার ফল, কয়েকটি নম্বর কিংবা ভর্তি পরীক্ষার সাফল্য-ব্যর্থতার ওপর আমরা একজন মানুষের যোগ্যতা বিচার করি। বোর্ড পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না করলে পরিবারের চাপ শুরু হয়। ভর্তি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে।
অথচ একটি ফলাফল কখনোই একজন মানুষের সম্পূর্ণ যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।
প্রশ্ন হলো- এর দায় কি শুধু ওই ব্যক্তির? পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের কি কোনো দায় নেই? একজন মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু যারা নিজেদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, তাদের কি এই মৌলিক জিনিসগুলোর কমতি ছিল? না, তাদের মানসিক নিরাপত্তা ও শান্তির কমতি ছিল।
অথচ আমাদের সমাজে মানসিক কষ্টকে এখনও অনেক সময় গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। কেউ হতাশার কথা বললে তাকে বলা হয়, সবাই এমন অনুভব করে, 'এত সেনসিটিভ হওয়ার কী আছে?' কিংবা 'নাটক করছ।' এভাবেই একজন মানুষের কষ্ট ধীরে ধীরে আরও গভীরে চলে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- সংকটে থাকা মানুষ অনেক সময় আচরণের মাধ্যমে সাহায্যের প্রয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। তারা চুপচাপ হয়ে যেতে পারে, মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে, আগের মতো কোনো কাজে আগ্রহ না দেখাতে পারে কিংবা সবসময় ক্লান্ত ও বিষণ্ন থাকতে পারে। কিন্তু আমরা কতজন সেই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করি?
আমরা বিচার করতে শিখেছি, কিন্তু শুনতে শিখিনি। কেউ আত্মহত্যা করেছে- এ খবর শুনে আমরা প্রশ্ন করি, কেন করল? তার আবার কীসের অভাব ছিল? অথচ তার জীবনের শেষ সময়টুকু কতটা কঠিন ছিল, সে কার কাছে সাহায্য চাইতে চেয়েছিল, কিংবা তার নীরবতার ভেতরে কী চলছিল- সেসব জানার চেষ্টা করি না। মৃত্যুর পর কারণ খোঁজার চেয়ে জীবিত অবস্থায় একজন মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক বেশি জরুরি।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাউন্সেলিং সেন্টার থাকলেই হবে না, সেখানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ভয় বা সামাজিক বিচার ছাড়াই তাদের সমস্যার কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
তবে পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে পরিবার থেকেই। সন্তানের কথা শুনতে হবে। তার ওপর নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সবাই একই বিষয়ে ভালো হবে- এমন কোনো নিয়ম নেই। প্রত্যেকের নিজস্ব মেধা, আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। পারিবারিক সমস্যা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সমস্যার নেতিবাচক প্রভাব যেন সন্তানের মানসিক জগৎকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। কারণ বড়দের কাছে যে বিষয়টি 'স্বাভাবিক পারিবারিক ঝামেলা' একটি শিশুর কাছে সেটিই হতে পারে গভীর অনিরাপত্তার কারণ।
আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু শুধু এই কথাটি বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। একজন মানুষ যখন গভীর সংকটে থাকে তখন তাকে উপদেশ দেওয়ার আগে তার কথা শুনতে হবে, তার কষ্টকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
আমাদের দায়িত্ব শুধু একটি মৃত্যুর পর আফসোস করা নয় বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ ভেঙে পড়ার আগেই বলতে পারে- আমি ভালো নেই। কারণ একটি জীবন হারানোর পর প্রশ্ন করার চেয়ে, সেই জীবনটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য সময়মতো পাশে দাঁড়ানো অনেক বেশি জরুরি। শেষ প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়- আমরা কি সত্যিই তাদের শুনেছিলাম?
লেখক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।