প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান আধুনিক ও যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের যাপিত জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল এবং উন্নত হলেও এক গভীর শূন্যতা আমাদের তাড়া করে ফিরছে। আমরা অঢেল সম্পদের পেছনে ছুটছি, আকাশচুম্বী সাফল্যের সিঁড়ি ভাঙছি; কিন্তু দিনশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলেই উত্তর আসছে— শান্তি কোথায়? আজ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে এটি প্রমাণিত যে, মানসিক শান্তিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং প্রকৃত সুখের মূল চাবিকাঠি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অর্জনের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হচ্ছি, বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসছি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা এবং মানসিক চাপ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক অসুস্থতা। সাফল্যের এই অন্ধ ইঁদুর দৌড় আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগী করলেও মনের স্বাস্থ্যের বিষয়টি সবসময়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, একটি শান্ত ও স্থির মন ছাড়া শরীর কখনোই সুস্থ থাকতে পারে না। মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত প্রত্যাশা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে আমরা অন্যের জীবনের চাকচিক্য দেখে নিজের বাস্তবতাকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করি। ভার্চুয়াল জগতের এ 'নিখুঁত জীবনের' প্রদর্শনী সাধারণ মানুষের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। যখন মানুষের প্রত্যাশা তার সাধ্যকে ছাড়িয়ে যায়, তখনই অস্থিরতা শুরু হয়। মানসিক শান্তি বজায় রাখতে হলে আমাদের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। অল্পে তুষ্টি বা 'কনটেন্টমেন্ট' হলো মানসিক প্রশান্তির প্রথম ধাপ। মানুষ সামাজিক জীব, কিন্তু বর্তমানের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে। লোকদেখানো সম্পর্কের আধিক্য থাকলেও মনের কথা খুলে বলার মতো বিশ্বস্ত মানুষের অভাব প্রকট। পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এবং সামাজিক বিচ্যুতি মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে তছনছ করে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ়, তারা কঠিন পরিস্থিতিতেও মানসিকভাবে বেশি সুস্থ থাকেন। মনের শান্তি টিকিয়ে রাখতে সুস্থ ও গঠনমূলক সামাজিক সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের অনিয়মিত ঘুম, পুষ্টিহীন খাবার এবং স্ক্রিন অ্যাডিকশন বা ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাতের পর রাত জেগে থাকা আর দিনের বেলা ক্লান্তিবোধ করা আমাদের স্নায়বিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছন্নতা আমাদের ভেতর এক ধরনের রুক্ষতা তৈরি করছে। অথচ প্রতিদিন মাত্র আধঘণ্টা প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো বা শরীরচর্চা করা মানসিক স্বাস্থ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে। মানসিক শান্তির একটি বড় অংশনির্ভর করে মানুষের আত্মিক শক্তির ওপর। যারা নিয়মিত প্রার্থনা করেন, ধ্যান বা ইয়োগা করেন, তাদের মাঝে ধৈর্য ও সহনশীলতা বেশি দেখা যায়। ক্ষমা করার মানসিকতা এবং অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে মনের ভেতরে এক ধরণের স্বর্গীয় প্রশান্তি অনুভূত হয়। স্বার্থপরতা এবং হিংসা মানুষের ভেতরের শান্তিকে কুরে কুরে খায়। পক্ষান্তরে, পরোপকার ও কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের মনকে অনেক বেশি হালকা এবং ইতিবাচক করে তোলে।
লেখক : শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়