ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান

কামনা মিম
শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান

দেশের তরুণ সমাজ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে। পরীক্ষার আগে রাত জাগে, ভালো ফলাফলের জন্য পরিশ্রম করে, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করে। সবকিছুর পেছনে থাকে একটি স্বপ্ন, একদিন একটি ভালো চাকরি হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, পরিবারকে সহযোগিতা করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের শেষে যখন হাতে আসে কাঙ্ক্ষিত সনদ, তখন মনে হয় এবার বুঝি সেই স্বপ্ন পূরণের পালা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন কথা বলে। সনদ হাতে নেওয়ার পরই শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অপেক্ষা, চাকরির আবেদন, পরীক্ষা, ভাইভা, একের পর এক প্রতিযোগিতা এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।

তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সমস্যাটা আসলে কোথায়? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত করছে না? নাকি দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগই পর্যাপ্ত নয়? একজন শিক্ষার্থী যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পরও কাজের সুযোগ না পান, তাহলে সমস্যাটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার নয়। আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও যদি প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া না যায়, তাহলে সেখানেও শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার পথটি আসলে একক কোনো সমস্যায় আটকে নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার মান, দক্ষতার ঘাটতি, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা।

একসময় একটি ভালো ফলাফল ও একটি ডিগ্রিকে চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রধান যোগ্যতা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান কর্মজগৎ অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। এখন শুধু ভালো ফলাফল বা একটি সনদ অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট নয়। একজন চাকরিপ্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের গুণ এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে, শিক্ষার্থী কি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য শিখছে, নাকি বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে? অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বই পড়ে, পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ভালো ফলাফল অর্জন করে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর তাকে নতুন করে শিখতে হয় কীভাবে একটি পেশাগত প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়, কীভাবে সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, কীভাবে একটি উপস্থাপনা দিতে হয়, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজকে সহজ করা যায় কিংবা বাস্তব কোনো সমস্যার সমাধান করতে হয়।

শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয় একজন তরুণের কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনে সহায়তা করা নয়; তাদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত করে তোলা। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি গবেষণা, বাস্তবভিত্তিক প্রকল্প, দলগত কাজ, উপস্থাপনা, ইন্টার্নশিপ, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সমস্যা সমাধানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়ে কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, তখন নিয়োগদাতার কাছে তার ফলাফলের পাশাপাশি প্রশ্ন থাকে, তিনি বাস্তবে কী করতে পারেন?

এ জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো জরুরি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই কর্মজগতের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। ইন্টার্নশিপও তখন শুধু সনদ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল যোগাযোগ, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কারণে কর্মক্ষেত্রের ধরনও বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক পুরোনো কাজের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কয়েক বছর আগে যে দক্ষতা একজন চাকরিপ্রার্থীর জন্য যথেষ্ট ছিল, ভবিষ্যতে সেটি হয়তো একা যথেষ্ট নাও হতে পারে। তাই পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু বর্তমান কর্মবাজারের জন্য নয়, পরিবর্তনশীল কর্মজগতের সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি শেখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মজগত প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হলে একজন তরুণকে কর্মজীবনেও নতুন নতুন বিষয় শিখতে হবে।

তবে কি সব দায় শিক্ষাব্যবস্থার? একেবারেই নয়। ধরা যাক, একজন তরুণ প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেছেন। তিনি প্রযুক্তি জানেন, যোগাযোগে দক্ষ, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ কি রয়েছে? এখানেই আসে সমস্যার আরেকটি বড় দিক, কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি না হলে শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি অর্থনীতিতে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং চাকরি পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ হবে।

তাই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কর্মসংস্থান মানেই শুধু সরকারি চাকরি নয়। আমাদের সমাজে এখনও অনেকের কাছে চাকরি বলতে মূলত সরকারি চাকরি বোঝায়। সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে এর প্রতি আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু একটি দেশের সব শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব শুধু সরকারি খাতের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বেসরকারি শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, প্রযুক্তিখাত, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, সেবা খাত, সৃজনশীল শিল্প, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগসহ সব ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।

একজন তরুণ যদি চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পান, তাহলে তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করবেন না; ভবিষ্যতে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন। তবে উদ্যোক্তা হতে হলে শুধু উৎসাহ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বাজারের সুযোগ, পরামর্শ এবং একটি সহায়ক পরিবেশ।

শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিগ্রিই সফলতার একমাত্র পথ, এমন ধারণা তরুণদের কর্মজীবনের বিকল্প পথগুলোকে সংকুচিত করে দিতে পারে। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি, ইলেকট্রনিকস, মেশিন পরিচালনা, ডিজিটাল সেবা কিংবা বিভিন্ন বিশেষায়িত পেশাগত দক্ষতারও শ্রমবাজারে প্রয়োজন রয়েছে।

একটি দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের দক্ষ মানুষের প্রয়োজন হয়।

তাই দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো জরুরি। তরুণরা যেন নিজেদের আগ্রহ, যোগ্যতা ও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন পেশা বেছে নিতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীর নিজের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই আলোচনায় শিক্ষার্থীর নিজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুধু পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। নিজের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ভাষা, যোগাযোগ, লেখালেখি, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট পেশার ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দূরত্ব কমাতে হলে কয়েকটি বিষয়কে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে। শুধু মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সুযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব কর্মজগতের সংযোগ বাড়াতে হবে। ইন্টার্নশিপ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। তৃতীয়ত, কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। কর্মবাজারের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। চতুর্থত, নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর খাতকে আরও বিকশিত করতে হবে। পঞ্চমত, শিক্ষার্থী ও চাকরিদাতার মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবেন কর্মক্ষেত্রে আসলে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন এবং নিয়োগদাতারাও প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।

একজন তরুণের হাতে সনদ তুলে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থার শেষ দায়িত্ব হতে পারে না। সেই সনদ যেন বাস্তব জীবনে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের একটি দরজা খুলে দেয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেই হবে না; সেই সুযোগে কাজ করার মতো দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন। অর্থাৎ শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান; এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একজন তরুণ শুধু একটি সনদ নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করবেন না; বরং সেই সনদের সঙ্গে থাকবে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের যোগ্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ দেওয়া নয়; শিক্ষা এমন সক্ষমতা তৈরি করবে, যা মানুষকে নিজের জ্ঞান কাজে লাগাতে এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে। আর সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো সুযোগ তৈরি করাও রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির যৌথ দায়িত্ব। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের পথ তাই যতটা সম্ভব ছোট, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করাই সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত