ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ওসমানী বিমানবন্দর : অপার সম্ভাবনার দ্বার

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ওসমানী বিমানবন্দর : অপার সম্ভাবনার দ্বার

নাম সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর। প্রতিষ্টা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল জাপানের আগ্রাসন রুখা। প্রথমে নাম ছিল সিলেট বিমানবন্দর। স্বাধীনতার পর সিলেটের কৃতিসন্তান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব.) আতাউল গনী ওসমানীর নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। বিমানবন্দর ও রানওয়ে সম্প্রসারণ করে ২০০২ সালে এটির নাম দেওয়া হয় সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে আন্তর্জাতিক হলেও আসলেই কি এটি পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলতে যা বুঝায় তা? সবকিছুর বিবেচনায় তো তা মনে হয় না।

সত্যিকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে তো বহুজাতিক এয়ারলাইনগুলোর ফ্লাইটগুলো (যেমন : কাতার এয়ারওয়েজ, তার্কিশ এয়ারলাইন্স, ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্স, এমিরাত এয়ারলাইন্স, জেট এয়ারওয়েজ, সৌদি এয়ারলাইন্স ইত্যাদি) সিলেট থেকে সরারসরি আসা যাওয়া করত বা সেখানে অবতরণ করার সুযোগ থাকত। শুধুমাত্র বিমানের কয়েকটি ফ্লাইট দেশের বাইরে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ও মধ্যপ্রাচ্যে যায় ও আসে। আর এতে করেই আন্তর্জাতিক হয়ে গেল? এটা তো অনেকটা 'কানা ছেলের পদ্মলোচন নাম' এর মতো হয়ে গেল না!

সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরকে সতিকার অর্থে ও পূর্ণাঙ্গভাবে আন্তর্জাতিক করতে অসুবিধা কি? কেন করা হচ্ছে না? যুগের পর যুগ ধরে শুনে আসছি রানওয়ে দীর্ঘ করার কথা ও রিফিউলিং- এর ব্যবস্থা করার কথা। কেন করা হচ্ছে না? রিফিউলিং আর রানওয়ে বড় করার কিচ্ছা আর কত দিন শুনব? পৃথিবীর ৯০টি দেশের অন্তত: ১৫০টি এয়ারপোর্ট দেখার ও ঐসব এয়ারপোর্টগুলো দিয়ে যাতায়াত করার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে। সাইপ্রাসের লারনাকা বিমানবন্দর, ইতালির রিমিনি শহরের রিমিনি বিমানবন্দর, আফ্রিকার দরিদ্র দেশ উগান্ডার এন্টেবে বিমানবন্দর— এগুলোর কোনোটাই তেমন বড় নয়। নিজ চোখে দেখেছি— অনেকটা সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের মতো। কিন্তু ওখানে সব ধরনের বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট নামতে পারলে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরে পারে না কেন? যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ ও বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে হিথ্রো বিমানবন্দর যা লন্ডন নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত। তারপরেও লন্ডনের ৫০ থেকে ৬০ মাইলের ভেতর Gatwick Airport, Stansted Airport ও Luton Airport নামের তিনটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর আছে। তথাপি খোদ লন্ডন সিটির ভেতর লন্ডন সিটি এয়ার নামে একটি বিমানবন্দর আছে, যা সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দর থেকে অনেক ছোট, অনেকটা অর্ধেক হবে। আমি লন্ডনের নিউহ্যাম বারার কাউন্সিল ও ডেপুটি স্পিকার ছিলাম। এ বারার একটি ওয়ার্ডে লন্ডন সিটি এয়ারপোর্ট অবস্থিত। এটির রানওয়ের দৈর্ঘ হচ্ছে মাত্র ৪৯৪৮ ফুট আর সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ হচ্ছে— ৯৬৪৬ ফুট। অথচ লন্ডন সিটি এয়ারপোর্ট থেকে গোটা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি আমেরিকায় ফ্লাইট যাওয়া-আসা করে। ২০১৮ সালে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী যাওয়া আসা করেছেন ৫,৩৩,২০৮ জন। অপরদিকে লন্ডন সিটি এয়ারপোর্ট দিয়ে ২০২২ সালে যাত্রী যাওয়া আসা করেছেন ৩০,০৯,৩১৩ জন। অর্থাৎ সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরের অর্ধের সাইজের লন্ডন সিটি এয়ারপোর্ট অনেকটা full-fledged আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে সার্ভিস দিয়েছে যার মধ্য দিয়ে ওসমানী বিমানবন্দরের চেয়ে ছয়গুন বেশি যাত্রী আসা-যাওয়া করেছেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর সময় প্রমাণ হয় যে, সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চাইলে বিদেশি যে কোনো এয়ারলাইন্স নামতে ও উঠতে পারে ও পারবে। কেননা, ঢাকা থেকে ডাইভার্টেড হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সিলেটে উঠা-নামা করেছে। ২৫ অক্টোবর ২০২২ ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং: শাহজালালে নামতে না পেরে ওসমানীতে অবতরণ করল শিরোনামে রিপোর্ট করেছে। এতে বলা হয় 'জরুরিভিত্তিতে অবতরণ করেছে ৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। রাত ১১টা থেকে দেড়টার মধ্যে এসব ফ্লাইট অবতরণ করে। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক যেকোনো ফ্লাইট সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে সক্ষম।

অনেকে মনে করেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও দুর্নীতিবাজ কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কারণে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দর সত্যিকার অর্থে ও পূর্ণাঙ্গভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে উঠছে না। এর ফলে বহির্বিশ্বে থাকা সিলেটের যাত্রীরা অযথা বৈষম্য ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ব্রিটেন থেকে চড়া দামে তারা শুধুমাত্র বাংলাদেশ বিমানের টিকিট কিনে সিলেট যেতে হচ্ছে। কাতার বা তার্কিশ এয়ারলাইন্সে যেখানে ৫০০ বা ৬০০ পাউন্ডে লন্ডন থেকে ঢাকা যাওয়া যায়, সেখানে বিমানে লন্ডন থেকে সিলেটে ডাইরেক্ট ফ্লাইটে যেতে গুণতে হয় ১০০০ পাউন্ড থেকে ১৪০০ পাউন্ড। অর্থাৎ দ্বিগুন বা দ্বিগুণের কাছাকাছি! আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ইংল্যান্ড থেকে বিমান প্রথমে সিলেটে যায়।

এরপর যায় ঢাকাতে। এখানেও ঢাকা থেকে সিলেটের ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ পাউন্ড বেশি! এর কারণ মোটেই বোধগম্য নয়। এটা তো রীতিমতো সিলেটের প্রতি বৈষম্যমূলক ও বিমাতাশুলভ আচরণ। পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করত: বিভিন্ন দেশের বিমান বা এয়ারলাইন্সকে অরতরণের জন্য উন্মোক্ত করে দিলে সার্ভিসের মান ও ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হতো যা তুলনা ও যাচাই করে যাত্রীরা অপেক্ষাকৃত ভালোটা বেছে নিতে পারতেন। বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইন্স উঠানামা করলে এভিয়েশন ফি, ল্যান্ডিং চার্জ, Fuel Costs ও পার্কিং চার্জসহ বিভিন্ন খাত থেকে বিপুল পরিমান অর্থ বাংলাদেশ আয় করতে পারত। এই সুযোগটি হাতছাড়া হচ্ছে।

ভৌগোলিকভাবে সিলেটের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এটা ভেবেই কিন্তু ব্রিটিশরা সিলেটে বিমানবন্দর স্থাপন করেছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটে আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শিমুল বাগান, দেশের বৃহৎ জলপ্রভাত মাধবকুন্ড, লালাখাল, রাতারগুল জলাবন, বিছানাকান্দি, ডিবির হাওর, মালনীছড়া চা বাগান, জাফলং, তিন নদীর মোহনা, তামাবিল, সাদাপাথর, ক্বীন ব্রিজ, ওসমানী জাদুঘর, আলী আমজদের ঘড়িসহ বহু দর্শনীয় ও প্রাকৃতিক স্থানের সমারোহ এই সিলেটে। সিলেটকে বলা হয় বাংলাদেশের আধ্যাত্বিক রাজধানী, ওলীকুল শিরোমনী হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরাণ (র.) এই সিলেটে শুয়ে আছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের বিশেষ উপলক্ষ ও নির্বাচনকে ঘিরে তাদের কার্যক্রম সাধারণত শুরু করেন সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে। দুটি মাজারসহ সিলেটের উপরোক্ত প্রাকৃতিক ও দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতি দিন সিলেটে ভিড় জমান হাজার হাজার পর্যটক।

এমতাবস্থায়, পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার অর্থে ওসমানী বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হলে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। গোটা ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সিটি থেকে ২/৩ ঘণ্টার ফ্লাইটে পর্যটকরা সিলেটে আসতে পারেন উপরোল্লিখিত প্রাকৃতিক ও দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে। অনেক বিদেশিরা ডে ট্রিপে বা ২/৩ দিনের ইউকএন্ড ব্রেকে (সপ্তাহান্তের ছুটিতে) আসতে পারেন সিলেটে, যেভাবে ব্রিটিশ ভ্রমণপিপাসুরা যান ইউরোপের বিভিন্ন সিটি ও দর্শনীয় স্থান দেখতে। এতে সিলেট হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চক্রকেন্দ্র। বাংলাদেশ সরকার ট্যুরিজম থেকে বিপুল অর্থ আয় করতে পারে। অপরদিকে সিলেটের লাখ লাখ অধিবাসী ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকায় বসবাস করেন। শুধু যুক্তরাজ্যেই বসবাস করছেন প্রায় সাত লাখের উপর সিলেটের অধিবাসী। তাদের 'ওয়ান ম্যান শপ' এর মতো চড়া দামে শুধু বিমানে আসা-যাওয়া করতে বাধ্য না করে অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলোকে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করার সুযোগ দিলে তারা সিলেটে নিজে ও পরিবারকে নিয়ে ঘনঘন বেড়াতে আরও বেশি আগ্রহী হবেন, আগ্রহী হবেন বিনিয়োগ করতে অথবা এরইমধ্যে করা বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রকারান্তরে লাভবান হবে। প্রতিযোগিতার কারণে বিমানের সেবার মানও বাড়বে। তার সঙ্গে সঙ্গে কমবে বা বন্ধ হবে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় আসা বিমান সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি।

বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি ট্যুরিজমের উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি, প্রাকৃতিক কোনো সৌন্দর্য নেই— এমন অনেক দেশও কৃত্রিম উপায়ে দর্শনীয় স্থান বানিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ট্যুরিষ্টদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। অথচ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্রষ্টা প্রদত্ত। কিন্তু আমরা এ স্রষ্টা প্রদত্ত অপার সম্ভাবনাকেও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। শুধু নামেই নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার অর্থে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করা হলে বাংলাদেশের জন্য অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। দেশ ও সরকারের একেবারে উচ্চ মহলের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সালাম এয়ার সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ঘোষণা দিয়েছেন, অতি শিগগিরই টার্কিশ এয়ারলাইন্স সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু করবে। এটা খুবই আনন্দের কথা। বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই পর্যায়ক্রমে কাতার, আমিরাত ও সৌদি এয়ারলাইন্সও সিলেট থেকে সত্তর ফ্লাইট চালু করুক। সরকার যেন তাদের ফেসিলিটেট করেন। উপরোক্ত এয়ারলাইন্সগুলো নামতে পারলেই শুধু সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হবে। আমরা সেই প্রত্যাশায় রইলাম।

লেখক : আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত