ঢাকা শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

লাইব্রেরি আছে, পাঠক নেই

মুহিবুল হাসান রাফি
লাইব্রেরি আছে, পাঠক নেই

লাইব্রেরির তাকজুড়ে বই। কোথাও নতুন মলাটের ঝকঝকে বই, কোথাও বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা পুরোনো সংগ্রহ। টেবিল-চেয়ারও আছে, আছে নির্ধারিত কক্ষ। কিন্তু নেই কোলাহল, নেই পাঠকের নিয়মিত উপস্থিতি। অনেক লাইব্রেরির বাস্তবতা যেন এমনই: অবকাঠামো আছে, বই আছে, কিন্তু বই পড়ার মানুষ কম। প্রশ্নটা তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লাইব্রেরি আছে, পাঠক কোথায়?

একসময় বই ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রধান জানালা। এখন সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও অসংখ্য ডিজিটাল মাধ্যম। কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যাচ্ছে বিপুল তথ্য। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য মানেই জ্ঞানচর্চার বিস্তার নয়। বরং দ্রুতগতির কনটেন্টের অভ্যাস অনেককে দীর্ঘ লেখা পড়া, একটি বিষয়ের গভীরে যাওয়া কিংবা একটি বই শেষ করার ধৈর্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

এখানেই লাইব্রেরির গুরুত্ব আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। কারণ লাইব্রেরি শুধু তথ্য দেয় না; পাঠককে থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। একটি বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় থাকা মানুষের মনোযোগ, বিশ্লেষণক্ষমতা ও কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করছি? সমস্যার একটি অংশ পাঠাভ্যাসে, অন্য অংশ লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনায়। বহু প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বই নিয়মিত যুক্ত হয় না।

সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, প্রযুক্তি, সমসাময়িক বিশ্ব কিংবা ক্যারিয়ারবিষয়ক বইয়ের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের উপযোগী আকর্ষণীয় বইয়েরও ঘাটতি দেখা যায়। কোথাও লাইব্রেরি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়, কোথাও বসার পরিবেশ পাঠবান্ধব নয়। আবার অনেক জায়গায় লাইব্রেরি কার্যক্রমের সাফল্য মাপা হয় বইয়ের সংখ্যা দিয়ে; সক্রিয় পাঠক কতজন, মাসে কত বই পড়া হচ্ছে এসব প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংকটটি আরও গভীর। পরীক্ষার ফল, অ্যাসাইনমেন্ট ও চাকরির প্রস্তুতির চাপের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীকে 'বই পড়তে হবে' বলা হয়, কিন্তু কেন পড়বে, কী পড়বে এবং পড়ার আনন্দ কোথায় সেটি বোঝানোর উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে লাইব্রেরি অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞানচর্চার জায়গা না হয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন মেটানোর একটি স্থান হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর হাতে ছোটবেলা থেকেই বই তুলে দেওয়ার সংস্কৃতি দুর্বল হলে ভবিষ্যতে তার স্বতঃস্ফূর্ত পাঠক হয়ে ওঠা কঠিন। ঘরে যদি বইয়ের চেয়ে শুধু পরীক্ষার ফল, মোবাইল কিংবা বিনোদনই বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে লাইব্রেরির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হবে কীভাবে? তবে প্রযুক্তিকে দোষারোপ করেও সমাধান হবে না। বরং প্রযুক্তিকে পাঠাভ্যাসের সহযোগী করতে হবে। ডিজিটাল ক্যাটালগ, ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন রিজার্ভেশন ও ডিজিটাল আর্কাইভের সঙ্গে প্রচলিত বইয়ের সমন্বয় করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও বইয়ের প্রচার, পাঠচক্র ও পাঠক তৈরির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

প্রয়োজন লাইব্রেরিকে 'বই রাখার ঘর' থেকে 'জ্ঞান ও চিন্তার কেন্দ্র' এ রূপান্তর করা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠচক্র, বই আলোচনা, লেখক-পাঠক সংলাপ, বই পরিচিতি ও পাঠ-উৎসব আয়োজন করা যেতে পারে। শিশুদের জন্য আলাদা পাঠক কর্নার, শিক্ষার্থীদের পছন্দ অনুযায়ী বই নির্বাচন এবং নির্দিষ্ট 'পাঠঘণ্টা' চালু করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের লাইব্রেরিগুলোতেও মাসিক পাঠকসভা বা বইভিত্তিক আলোচনার আয়োজন করা সম্ভব। লাইব্রেরির বাজেট বাড়ানো অবশ্যই জরুরি, কিন্তু শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই পাঠক তৈরি হবে না। দরকার পাঠককেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা।

কোন বই পড়া হচ্ছে, কোন বইয়ের চাহিদা বেশি, পাঠকের বয়স ও আগ্রহ কী এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংগ্রহ ও কার্যক্রম সাজাতে হবে। লাইব্রেরির সাফল্যের সূচকও বদলাতে হবে। কতটি বই আছে তার পাশাপাশি কতজন সক্রিয় পাঠক আছে, বছরে কতটি বই পড়া হচ্ছে এবং কতজন নতুন পাঠক যুক্ত হচ্ছে সেগুলোও বিবেচনায় আসা দরকার।

কারণ একটি সমাজের জ্ঞানচর্চা শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না; তার পাঠাভ্যাসও সেই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক। তাই এখন সময় লাইব্রেরির দরজা শুধু খোলা রাখার নয়, পাঠকের জন্য দরজা উন্মুক্ত করার। নতুন ভবন, নতুন তাক, নতুন বই সবই প্রয়োজন। কিন্তু বই খুলে বসার মানুষ না থাকলে সেই আয়োজন অসম্পূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই লাইব্রেরি কতটি আছে এতে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন করতে হবে, কতজন নিয়মিত পাঠক তৈরি হয়েছে? কতজন বই পড়ছে? আর সেই পড়া কতটা বদলে দিচ্ছে তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন? কারণ পাঠকহীন লাইব্রেরি একটি স্থাপনা মাত্র; পাঠকসমৃদ্ধ লাইব্রেরিই একটি সমাজের চিন্তার বাতিঘর।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত