প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
শিক্ষকতা একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। আর সেই ব্রতকে যিনি ১৯৯৭ থেকে ধরে নীরবে পালন করে যাচ্ছেন, তিনি হলেন আমার আদর্শ, আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা তাজ। স্যারের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। বরিশালের নদী, খাল-বিল আর সবুজ মাঠের মতোই স্যারের মনটাও বিশাল ও উদার। বরিশালের মানুষের অতিথিপরায়ণতা, সরলতা আর মাটির গন্ধ— সবকিছুই স্যারের মধ্যে আছে। তিনি যখন কথা বলেন, মনে হয় যেন বরিশালের কোনো নদীর মতো শান্তভাবে বয়ে চলেছেন। স্যার সেই সঙ্গে বর্তমানে বান্দরবানের সবুজ প্রকৃতি সঙ্গে প্রতিনিয়ত মিশে আছেন।
কলেজে শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বান্দরবানবাসীর সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন নিজেকে এবং নিজের মূল্যবান সময়কেও বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের সেবায়। এমনকি শিক্ষা, চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় সেবায়ও ওতপ্রোতভাবে নিয়োজিত আছেন। যা এক দেশের সম্পদের রুপান্তর। স্যার বান্দরবানে থাকেন বলে প্রায়ই বান্দরবানের পাহাড়, প্রকৃতি, সহজ-সরল মানুষের গল্প করেন। তিনি বলেন, প্রকৃতি সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তিনি সবুজের মাঝে থেকে আমাদের শেখান কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে সমাজের জন্য কাজ করতে হয়।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কঠিনতম সময়। যখন দেশের অনেক সুশীল সমাজ, অনেক বড় মানুষ ভয়ে চুপ ছিলেন, ফেসবুকে একটি পোস্ট দিতেও সাহস পাননি, তখন স্যার নিজের জায়গায় বসে একজন কলেজ শিক্ষক হয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পক্ষে কলম ধরেছেন, সাহস যুগিয়েছেন, পাশে থেকেছেন শেষ পর্যন্ত।
তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা পোস্টে ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বান্দরবানে থেকেও তিনি অনলাইনে যুক্ত ছিলেন, প্রতিবাদ করেছেন। তিনি ছাত্রদের ভয় না পেতে বলেছেন, আবু সাঈদকে স্যালুট জানিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের স্থাপনা রক্ষা করতে বলেছেন, শহিদদের বাড়ি যেতে বলেছেন। বান্দরবানের মতো শান্ত জায়গা থেকে তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ক্লাসে যখন তিনি 'সোনার তরী' আবৃত্তি করেন, তখন মনে হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পাহাড়ি হাওয়াই যেন বয়ে যাচ্ছে। তার উচ্চারণ, তার শব্দচয়ন, তার সাহিত্য বিশ্লেষণ— সবকিছুর পেছনে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সমৃদ্ধ শিক্ষা।
১৯৯৭ সাল। সাতকানিয়ার বাজালিয়ায় অবস্থিত কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম ডিগ্রি কলেজ তখনো আজকের মতো বড় হয়নি। অল্প কিছু শিক্ষক, হয়তো মাটির রাস্তা। সেই সময়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে স্যার আসেন এ কলেজে।
২৮ বছরে তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে মানুষ করেছেন। তার ছাত্ররা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। তিনি কখনো ছাত্রদের মধ্যে ভেদাভেদ করেন না। মেধাবী-দুর্বল— সবার জন্য তার দরজা খোলা। তিনি দুর্বল ছাত্রকে বেশি সময় দিতেন। বলতেন, ভালো ছাত্র তো নিজেই ভালো করবে, দুর্বল ছাত্রকে টেনে তোলাই শিক্ষকের আসল কাজ। আমার ইন্টারমিডিয়েট জীবনের দুই বছর মানেই স্যার। আমার জীবনের প্রতিটি সুন্দর মুহূর্তে স্যার আছেন।
প্রথম স্মৃতি : প্রথম বর্ষের প্রথম বাংলা ক্লাস। আমি ভীষণ ভয় পেতাম। স্যার এসে বললেন— স্বরবর্ণ শুদ্ধ উচ্চারণ কর, একটু উচ্চারণগত ভুল হওয়ায় আমি ভয় পেয়ে যাচ্ছিলাম। স্যার সঙ্গে সঙ্গে অভয় দিলেন।
বললেন— 'তুমি আমাদের মেয়ে, তুমি তো পারবে। শুধু চেষ্টা কর আর ইচ্ছা শক্তি বাড়াও। আমি তো সঙ্গেই আছি, ভয় কিসের, আমি তো শিখাতে এসেছি। তোমরা ভুল করবে আর আমি শূদ্রে দেব। তোমরা তো আমার মেয়ের মতোই। বাবাদের প্রশ্ন করবে উত্তর দিতে প্রস্তুত আছি। ওই এক কথায় আমার সব ভয় কেটে গিয়েছিল।
তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সন্তানের ন্যায় স্নেহ করেন। স্যারকে এখনও কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে ফোন কল দিলেই প্রথম প্রশ্ন করেন 'মামণি তুমি কেমন আছ? যে বাক্যে, আমি বাবা-চাচাদের ন্যায় আদর মোহাব্বত ও স্নেহের ঘ্রাণ পাই। স্যার আমার আদর্শ, আমার পথপ্রদর্শক, আমার অনুপ্রেরণা। কারণ তিনি একজন ভালো মানুষ। উদারতায় ভরপুর যার মন।
মানুষকে বড্ড বেশি ভালোবাসে। সততার জায়গায় শতভাগ। যার ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। আজকের দিনে ভালো রেজাল্ট অনেকের আছে, ভালো চাকরি অনেকের আছে; কিন্তু ভালো মানুষ কয়জন আছে? স্যার একজন ভালো মানুষ এবং একজন আদর্শবান ব্যক্তিত্ব।
স্যার আমার সাহসের জায়গা— যখন আমি ভেঙে পড়ি, তিনি বলেন 'তুমি পারবে'। তিনি শেখান, 'ভালো রেজাল্টের আগে ভালো মানুষ হও।' এ শিক্ষাটাই আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আজ আমি চট্টগ্রাম কলেজে বাংলা বিভাগে পড়ি। এখানে প্রতিটি শিক্ষক অসাধারণ, তাদের অবদানও অনস্বীকার্য। তারা আমাকে নতুন করে বাংলা চিনিয়েছেন, সাহিত্যের গভীরে নিয়ে গেছেন। আমি তাদের প্রতিও বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু আমার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন প্রিয় তাজ স্যার।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
প্রাক্তন ছাত্রী, কর্নেল (অব.) অলি
আহমদ বীর বিক্রম ডিগ্রি কলেজ