ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পারিবারিক বাজেট সামলানো ও বাস্তবতা

সাবনীহা ইয়াছমিন
পারিবারিক বাজেট সামলানো ও বাস্তবতা

মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসার পরই অনেক পরিবারের হিসাব শুরু হয় কোন খাতে কত খরচ হবে, কোথায় ব্যয় কমানো যায়, আর কতটুকু সঞ্চয় সম্ভব। কিন্তু মাস যত এগোয়, হিসাবের খাতা ততই যেন বাস্তবতার কাছে হার মানে। আয় সীমিত, অথচ প্রয়োজনের পরিধি ক্রমবর্ধমান। ফলে পারিবারিক বাজেট এখন শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি অনেক পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পারিবারিক বাজেটের ওপর সবচেয়ে দৃশ্যমান চাপ তৈরি করছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও বিদ্যুতের বিল মেটানোর পর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। আয় একই থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে আগের মতো প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়। তখন অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় বাজেটের বড় অংশ দখল করে নেয়। পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষার খরচ, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন বাজারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়ে। হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি পূর্বপরিকল্পিত বাজেট মুহূর্তেই ভেঙে দিতে পারে।

জরুরি সঞ্চয় না থাকলে অনেককে ধার বা ঋণের আশ্রয় নিতে হয়, যা পরবর্তী মাসগুলোর ব্যয়ের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। শুধু আয় কম হওয়াই সমস্যার কারণ নয়, ব্যয়ের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য বুঝতে না পারা, পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং সামর্থ্যের বাইরে জীবনযাপনের প্রবণতা অনেক পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপে ফেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনযাপন দেখে একই ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। অনলাইন কেনাকাটার সহজলভ্যতা ও কিস্তিতে পণ্য কেনার সুযোগও কখনও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ায়। তবে সব আর্থিক সংকটকে ব্যক্তিগত অপচয়ের ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মৌলিক প্রয়োজনের ব্যয়ই যখন আয়ের তুলনায় বেশি হয়, তখন শুধু সাশ্রয় করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।পারিবারিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক পরিবারে নারীরাই দৈনন্দিন বাজার, রান্নার উপকরণ, সন্তানের প্রয়োজন ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলান। সীমিত অর্থে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের সব সদস্যকে আয়, ব্যয় ও সঞ্চয়ের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এ সংকট মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন বাস্তবসম্মত বাজেট পরিকল্পনা। মাসের শুরুতেই খাবার, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা উচিত।

প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখা, বাজারের আগে তালিকা তৈরি এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়িয়ে চলা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে জরুরি তহবিল গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করাও জরুরি, যাতে কিস্তির চাপ পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনকে বাধাগ্রস্ত না করে।তবে পারিবারিক বাজেটের সংকট সমাধানের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ব্যক্তিগত সাশ্রয়ের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। তাই পারিবারিক বাজেট শুধু অর্থের হিসাব নয়, এটি পরিবারের বর্তমান প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুশৃঙ্খল ব্যয় পরিকল্পনা ও সচেতন সিদ্ধান্ত পরিবারকে অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তির জন্য প্রয়োজন আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ। পারিবারিক বাজেটকে তাই বোঝা নয়, বরং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।

লেখক : ইডেন মহিলা কলেজ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত