প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায় হলো- সঠিক নিয়মে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। প্রতিদিন আমরা দরজার হাতল, মুঠোফোন, টাকার নোট, যানবাহনের হাতলসহ বিভিন্ন বস্তু স্পর্শ করি। এসবের মাধ্যমে হাতে জীবাণু জমতে পারে। পরে সেই হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করলে কিংবা খাবার গ্রহণ করলে জীবাণু শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। ফলে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস জনপ্রিয় করা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর গুরুত্ব তুলে ধরা। ২০২৬ সালের এই দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত— পরিচ্ছন্ন হাতের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সবার জন্য নিরাপদ হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
হাত ধোয়ার গুরুত্ব ও জনস্বাস্থ্যে প্রভাব : হাতের মাধ্যমে জীবাণু এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তি, খাবার কিংবা বিভিন্ন পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার তৈরির আগে কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যার সময় হাতে রোগজীবাণু লেগে যেতে পারে। হাত যথাযথভাবে পরিষ্কার না করলে এসব জীবাণু শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ডায়রিয়াজনিত অসুস্থতা এবং শ্বাসতন্ত্রের কিছু সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এর সুফল ব্যক্তিগত সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস সংক্রমণের বিস্তার কমাতে ভূমিকা রাখে।
ডায়রিয়া ও অন্ত্রের সংক্রমণ : দূষিত হাত, পানি কিংবা খাবারের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বারবার পাতলা পায়খানা হলে পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে।
শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ : কিছু জীবাণু দূষিত হাতের মাধ্যমে চোখ, নাক ও মুখে পৌঁছাতে পারে। নিয়মিত হাত ধোয়া এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
খাদ্যবাহিত অসুস্থতা : খাবার তৈরির আগে এবং কাঁচা মাছ, মাংস বা ডিম ধরার পর হাত পরিষ্কার না করলে জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া হতে পারে।
কিছু পরজীবী সংক্রমণ : দূষিত মাটি, মল বা অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু পরজীবী ও তাদের ডিম শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন এসব সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক। তবে সব সংক্রমণ হাতের মাধ্যমে ছড়ায় না। তাই হাত ধোয়ার পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন, পরিচ্ছন্ন খাবার এবং প্রয়োজনীয় টিকাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
যখন হাত ধোয়া জরুরি : দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি সময়ে হাত ধোয়ার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে— টয়লেট ব্যবহারের পর এবং শিশুর মল পরিষ্কার করার পর, খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে এবং খাওয়ার আগে, শিশুকে খাওয়ানো বা পরিচর্যা করার আগে, হাঁচি-কাশির পর ও নাক পরিষ্কারের পর, অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যার পরে, কাঁচা মাছ, মাংস, ডিম কিংবা অপরিষ্কার সবজি ধরার পর, আবর্জনা, ময়লা বা পশুপাখি ধরার পর, বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে এবং হাত দৃশ্যত নোংরা হলে, ক্ষতস্থান পরিচর্যা করার আগে ও পরে। এসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে জীবাণুর বিস্তার কমানো সম্ভব।
সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার পদ্ধতি : শুধু পানিতে হাত ভেজানো যথেষ্ট নয়। সাবান দিয়ে হাতের সব অংশ ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ৪০-৬০ সেকেন্ড সময় রাখা যায়। প্রথমে পরিষ্কার প্রবহমান পানিতে হাত ভিজিয়ে পর্যাপ্ত সাবান নিতে হবে। এরপর দুই হাতের তালু, হাতের পিঠ, আঙুলের ফাঁক, আঙুলের পিঠ, বুড়ো আঙুল, নখের চারপাশ ও আঙুলের ডগা ভালোভাবে ঘষতে হবে। তারপর পরিষ্কার পানিতে সাবান ধুয়ে ফেলতে হবে এবং পরিষ্কার তোয়ালে বা নিরাপদ ব্যবস্থায় হাত শুকিয়ে নিতে হবে। নখের নিচে ময়লা জমতে পারে বলে নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখা উচিত। হাত ধোয়ার পর অপরিচ্ছন্ন কাপড় বা দূষিত পৃষ্ঠে হাত মুছে ফেললেও পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হতে পারে।
শীতকালে হাত ধোয়ার গুরুত্ব : শীতকালে ঠান্ডার কারণে অনেকেই হাত ধোয়ার সময় কমিয়ে দেন কিংবা ঠান্ডা পানি এড়িয়ে চলেন। কিন্তু এ সময়ও হাতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেশি দেখা যেতে পারে। কিছু জীবাণু দূষিত হাতের মাধ্যমে চোখ, নাক ও মুখে পৌঁছাতে পারে। তাই খাবার তৈরির আগে, খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর এবং হাঁচি-কাশির পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন।
শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বক রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। বারবার হাত ধোয়া, অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার কিংবা ত্বকের উপযোগী নয় এমন সাবান ব্যবহারে শুষ্কতা ও ফাটল বাড়তে পারে। এ সমস্যা এড়াতে স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা কুসুম গরম পানি এবং মৃদু সাবান ব্যবহার করা ভালো। হাত ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে শুকিয়ে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগানো যেতে পারে। তবে ত্বক শুষ্ক হওয়ার আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় সময়ে হাত ধোয়া বন্ধ করা উচিত নয়। শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং যাঁদের ত্বক সংবেদনশীল, তাঁদের হাতের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ত্বকের যত্নেও গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবাণু দূর করার ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রার চেয়ে সাবান দিয়ে হাতের সব অংশ ভালোভাবে ঘষে ধোয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাবান-পানি না থাকলে করণীয় : সাবান ও নিরাপদ প্রবহমান পানি দিয়ে হাত ধোয়াই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। বাইরে থাকলে বা পানি-সাবান সহজলভ্য না হলে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হাত পরিষ্কারক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হাতে দৃশ্যমান ময়লা, তেল বা খাবারের অবশিষ্টাংশ থাকলে হাত পরিষ্কারক সাবান-পানির যথাযথ বিকল্প নয়। কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতাও সীমিত হতে পারে। তাই সুযোগ পেলেই সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে হাত ধোয়া উচিত।
শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা : শিশুরা খেলাধুলা, মাটি স্পর্শ এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বস্তু ব্যবহারের সময় সহজেই জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের বড়দের নিজেদের পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার উপযোগী স্থান, নিরাপদ পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। ছবি, ছড়া ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের বোঝানো যেতে পারে কখন এবং কেন হাত ধুতে হবে।
প্রবীণ ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও হাতের পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পরিচর্যাকারীদের খাবার দেওয়ার আগে, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সময় এবং চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহারের আগে ও পরে হাত পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে হাতের পরিচ্ছন্নতা : চিকিৎসাকেন্দ্রে হাতের পরিচ্ছন্নতা রোগী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রোগীকে স্পর্শ করার আগে ও পরে, জীবাণুমুক্ত কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পাদনের আগে, শরীরের তরলের সংস্পর্শের পর এবং রোগীর আশপাশের পরিবেশ স্পর্শ করার পর যথাযথভাবে হাত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। হাতের পরিচ্ছন্নতা অবহেলিত হলে চিকিৎসাসেবাসংশ্লিষ্ট সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এতে রোগীর সুস্থ হতে বেশি সময় লাগা, চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধি এবং গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই চিকিৎসাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি, সাবান ও হাত পরিষ্কারকের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হাতের পরিচ্ছন্নতাকে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগীর নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশে হাত ধোয়ার সুযোগ ও জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশে হাত ধোয়ার অভ্যাস বাড়ানোর পাশাপাশি সাবান ও নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের বহুসূচক গুচ্ছ জরিপের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, দেশের ৬৮.৬ শতাংশ পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি এখনো রয়েছে। এ পরিসংখ্যান হাত ধোয়ার অভ্যাসের হার নয়; এটি বাড়িতে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকার সূচক। শুধু সচেতনতামূলক প্রচার চালালেই হবে না; প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। গ্রাম ও শহরের বাসাবাড়ি, বিদ্যালয়, বাজার, গণশৌচাগার, রেস্তোরাঁ, বাসস্টেশন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাত ধোয়ার উপযোগী স্থান স্থাপন করতে হবে। এসব স্থানে নিরাপদ পানি, সাবান, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় : হাত ধোয়ার অভ্যাসকে স্থায়ী করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হাসপাতাল ও বাজারে পরিচ্ছন্নতার সুবিধা বাড়ানো এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সাবান ও নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা বাড়ানো জরুরি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক সময়ে হাত ধোয়ার নিয়ম প্রচার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জনসমাগমস্থলে হাত ধোয়ার সুবিধা আছে কি না, সাবান ও পানি নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে কি না এবং ব্যবস্থাগুলো ব্যবহারযোগ্য রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সচেতনতাই হোক প্রতিদিনের অঙ্গীকার : বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোগ প্রতিরোধের জন্য সব সময় ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বা জটিল ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। সঠিক সময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সহজ অভ্যাসও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ১৫ অক্টোবরের এই দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিনের জীবনে পরিচ্ছন্ন হাতের চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো ও সুস্থ সমাজ গঠনের পথ আরও সুগম হবে। সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার হোক—সঠিক সময়ে, সঠিক নিয়মে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক