প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে গিয়ে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের প্রতারণা ও অনিশ্চিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার শিকার হন অনেক কর্মী। এ বাস্তবতায় মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে দেশটির নীতিগত সম্মতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পাশাপাশি বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে মালয়েশিয়ার সম্মতি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বৈধ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেল, ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি। সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ কর্মী নিয়োগে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু শ্রমবাজার চালু করা কিংবা এজেন্সির সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। অতীতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে নানা অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শুরু থেকেই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এজেন্সির কার্যক্রম পরিচালনা, নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র যাচাই এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো কর্মী যেন নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অর্থ দিতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়টি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। কোন শ্রেণির কর্মীরা এ সুযোগ পাবেন, কীভাবে তাদের নির্বাচন করা হবে এবং যাতায়াত, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় কে বহন করবে— এসব বিষয় আগেই পরিষ্কার করতে হবে। শুধু নিয়োগ ফি মওকুফ করে অন্য খাতে অর্থ আদায় করা হলে বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই সব ব্যয়ের পরিধি নির্ধারণ করে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কর্মীদের বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নিয়োগের আগেই লিখিতভাবে জানাতে হবে। অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং প্রতারণার শিকার কর্মীদের প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রেও অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা স্বচ্ছভাবে প্রণয়ন ও নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কর্মী পাঠানোর সংখ্যার চেয়ে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ কর্মীরা ঋণের বোঝা ছাড়াই বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং তাদের উপার্জন পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হোক নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও দুর্নীতিমুক্ত অভিবাসনের দৃষ্টান্ত।