ঢাকা রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আজ বিশ্ব শিল্পী দিবস

শিল্পের মর্যাদা ও শিল্পীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক

নজরুল ইসলাম
শিল্পের মর্যাদা ও শিল্পীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক

শিল্প মানুষের মনের ভাষা, সমাজের দর্পণ এবং সভ্যতার অন্যতম প্রধান পরিচয়। মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও জীবন সংগ্রামের নানা অনুভূতি শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গান, কবিতা, চিত্রকলা, নাটক, নৃত্য, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য কিংবা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই মানুষের চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করে। শিল্পের এ বহুমাত্রিক অবদানকে সম্মান জানানো এবং শিল্পীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই বিশ্ব শিল্পী দিবসের তাৎপর্য বিশেষভাবে স্মরণীয়।

শিল্প কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। একটি সমাজের সংকট, বৈষম্য, অন্যায় এবং মানুষের অধিকারবঞ্চনার চিত্র শিল্পীরা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে তুলে ধরেন। কখনো গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, কখনো কবিতা জাগিয়ে তোলে মানুষের বিবেক, আবার কখনো চিত্রকর্ম কিংবা চলচ্চিত্র সমাজের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাই শিল্পী কেবল স্রষ্টা নন, তিনি সমাজের বিবেক জাগ্রত রাখারও এক গুরুত্বপূর্ণ কারিগর।

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। লোকসংগীত, বাউলগান, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, যাত্রাপালা, পুঁথিসাহিত্য ও লোকশিল্প আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও শিল্পীরা তাদের সৃজনশীল শক্তি দিয়ে মানুষের মনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছেন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিনসহ অসংখ্য গুণী স্রষ্টার অবদান আমাদের সাংস্কৃতিক ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তবে শিল্পের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকলেও শিল্পীদের জীবন সব সময় সম্মানজনক ও নিরাপদ নয়। অনেক সময় অনেক শিল্পী আর্থিক অনিশ্চয়তা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, যথাযথ সম্মানীর সংকট এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের শিকার হন। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ পর্যায়ের শিল্পীরা প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। অনেক প্রবীণ শিল্পী জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা, বাসস্থান ও জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। এ বাস্তবতা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় বৈকি।

বিশ্ব শিল্পী দিবসে তাই শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা জানালেই কেবল দায়িত্ব শেষ হয় না। শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, সামাজিক নিরাপত্তা, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিল্পচর্চার সুযোগ বাড়াতে হবে, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পীদের কপিরাইট রক্ষা, তাদের সৃষ্টির যথাযথ মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সৃষ্টিশীল কাজের স্বত্ব সংরক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে শিল্পের প্রকাশ ও প্রচারের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি মৌলিক সৃষ্টির স্বীকৃতি ও আর্থিক অধিকার রক্ষার চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় শিল্পী, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব অপরিহার্য।

যে সমাজ শিল্পীকে সম্মান করে, সে সমাজ নিজের মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে সম্মান করে। বিশ্ব শিল্পী দিবস হোক শিল্পীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সৃজনশীল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারের দিন। শিল্পীর কণ্ঠ যেন, কখনো স্তব্ধ না হয়, তার তুলিতে যেন জীবনের রং মুছে না যায়, তার সৃষ্টিশীলতা যেন অবহেলায় হারিয়ে না পড়ে। শিল্প বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে মানুষের সৌন্দর্যবোধ, মানবিকতা ও প্রতিবাদের শক্তি। তাই শিল্পীর সম্মান নিশ্চিত করা মানেই একটি সুন্দর, সংবেদনশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাওয়া।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত