প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টেকসই অবস্থান নিশ্চিত করতে এখন শুধু জনশক্তি পাঠালেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও আধুনিক কর্মপরিবেশের উপযোগী জনশক্তি গড়ে তোলা। এ বাস্তবতায় প্রাথমিকভাবে এক লাখ আনসার-ভিডিপি সদস্যকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তা ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ সক্ষমতা আধুনিকায়নের উদ্যোগ এবং কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
গাজীপুরের সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ৬জি ওয়েল্ডিং, নির্মাণকাজ, ড্রাইভিং, তৈরি পোশাকশিল্প, আতিথেয়তা সেবা, রন্ধনশিল্প, সৌরবিদ্যুৎ ও সবুজ জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জাপানি ভাষার মতো চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে বাস্তবসম্মত। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো যত বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, ততই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
তবে এ উদ্যোগের সফলতার জন্য প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের বেতন কাঠামো, কর্মপরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা যাচাই করে দক্ষ সদস্যদের পাঠানোর যে কথা বলা হয়েছে, তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে কোনোভাবেই অনিরাপদ বা অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষকে পাঠানো যাবে না। নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করাই হতে হবে, এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
রিক্রুটিং লাইসেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত নারী ও পুরুষ সদস্যদের বিদেশে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হওয়া এ উদ্যোগকে নতুনমাত্রা দিয়েছে। একইসঙ্গে জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত চুক্তি ও অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও আশাব্যঞ্জক। সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ ও মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ সৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করে।
বিএমইটির ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে আনসার-ভিডিপির তৃণমূল নেটওয়ার্ক সমন্বয়ের উদ্যোগও প্রশংসার দাবি রাখে। ডিজিটাল ডেটাবেজ, বায়োমেট্রিক তথ্যব্যবস্থা ও কর্মপ্রত্যাশীদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে। বিদেশে কর্মরত সদস্যদের সার্বক্ষণিক সেবা ও নিরাপত্তা সহায়তায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামোও কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
আনসার-ভিডিপির এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু বিদেশেকর্মী পাঠানো নয়; দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা। প্রশিক্ষিত সদস্যরা দেশে থেকেও শিল্প ও সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ জনবলের চাহিদা পূরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনাটি যেন শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এক লাখ সদস্যকে দক্ষ করে তোলার এ উদ্যোগ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।