ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’

পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’

টানা ১৬ দিন ধরে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। প্রতিদিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। তবে, বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ায় ইরানজুড়ে বিক্ষোভের মাত্রা ও তীব্রতা কিছুটা কমেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাকচি বলেছেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের’ কারণে ইরানের বিক্ষোভ ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সংলাপ কিংবা যুদ্ধ’ যে কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত তার দেশ।

গতকাল সোমবার রাজধানী তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সৈয়দ আরাকচি বলেন, ‘ইরানে যা হচ্ছে, তা আর বিক্ষোভ নেই- সন্ত্রাসী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভের আড়ালে সন্ত্রাসীরা এই দেশ নাশকতা চালাচ্ছে, সাধারণ লোকজন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করছে। আর এই সন্ত্রাসীদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে। এমন বেশ কয়েকটি অডিও ক্লিপ বর্তমানে আমাদের হাতে এসেছে, যেখানে নাশকতা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

‘তবে এই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার এবং সামরিক বাহিনী সবসময়েই তৎপর। সন্ত্রাসীরা কখনও জিততে পারবে না। সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে।’ ইরানের বিক্ষোভে বিদেশি হস্তক্ষেপের জন্য সরাসরি ট্রাম্পকে দায়ী করে আরাকচি বলেছেন, ‘মূলত ট্রাম্পের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণেই উৎসাহী হয়েছে বিদেশি সন্ত্রাসীরা। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, যুদ্ধ কিংবা সংলাপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো কিছুর জন্য আমরা প্রস্তুত।’ গত দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে।

ইরানে বিক্ষোভে নিহত ৫৩৮ : ইরানে গত ১৫ দিন ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের শুরু থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৩৮ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ হাজার ৬ শতাধিক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি গত রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে এ তথ্য। তবে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহত ও বন্দির প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ গত তিন দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক কল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় বিক্ষোভে সহিংসতা ও হতাহত বিষয়ক তথ্য খুব কম জানা যাচ্ছে।

ইরানের কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে নিহত ও আহতদের ভিড়ে। রাজধানী তেহরানের একটি বড় হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, তাদের মর্গে লাশ রাখার আর জায়গা না থাকায় নতুন যেসব মরদেহ আসছে- সেসব ফেরত পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইরানের সরকার এখন পর্যন্ত আহত ও নিহতের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস একটি মুক্তভাবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাইয়ে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইন্টারনেট আন্তর্জাতিক ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে গত রোববার ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভে নিহত বেড়ে ৫৩৮ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যেই এমন হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প।

এত বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হওয়া প্রসঙ্গে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। ইরান সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না, জানতে চান। জবাবে এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকা ট্রাম্প বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, তারা (ইরান) সেটা শুরু করেছে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সামরিক বাহিনীও নজর রাখছে। আমরা খুব কঠিন কয়েকটি বিকল্প বিবেচনায় রাখছি। আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব-নিকাশ’ না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটনের হামলার জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা হামলা চালানো হবে।

ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন পোস্ট করলেন খামেনি : বিক্ষোভ দমনে ইরানের শাসকরা ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ এনেছে পশ্চিমা বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানের জনগণের মুক্তির সংগ্রামে সহায়তা করতে সেনা পাঠাবেন তিনি। ট্রাম্পের নানা উসকানিমূলক কথার ‘প্রতীকী’ জবাব দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্স।

ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্সে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি কার্টুন পোস্ট করা হয়েছে। কার্টুনটিতে প্রাচীন মিশরে মমি সংরক্ষণের বিশেষ কফিনে (সারকোফ্যাগাস নামে পরিচিত) ট্রাম্পের একটি ভঙ্গুর মূর্তি দেখানো হয়েছে। দেখে মনে হয় একটি পিরামিডের ভেতর ট্রাম্পের মুখাবয়ব সম্বলিত একটি সারকোফ্যাগাস রাখা হয়েছে। তবে ছবিতে কোনো মমি বা মানুষ দেখানো হয়নি। কার্টুনে চিত্রিত দেওয়াল ও সারকোফ্যাগাসের গায়ে প্রাচীন মিশরীয় লিপি হায়রোগ্লিফিক্স দৃশ্যমান। কার্টুনের সঙ্গে একটি বার্তা পোস্ট করা হয়। সেখানে প্রাচীন মিশরের ফেরাউনের মতো ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তী শাসকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, অত্যাচারী শাসক নমরুদের কথাও উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তারা যখন সবচেয়ে গৌরবময় অবস্থানে ছিলেন, তখন তাদেরকে উৎখাত করা হয়েছিল’। এমন কী, পাহলভি রাজবংশের প্রথম ও দ্বিতীয় শাহ রেজা খান ও মোহাম্মদ রেজার কথাও বলা হয়েছে ওই বার্তায়। খামেনির অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা বার্তায় বলা হয়, ‘যে ব্যক্তি গর্ব ও অহমিকার সঙ্গে ওখানে বসে গোটা বিশ্বের বিচার করছেন, তার জানা উচিৎ, যে ফেরাউন, নমরুদ, রেজা খান ও মোহাম্মদ রেজার মতো পৃথিবীর সকল স্বৈরাচারী ও অহংকারী মানুষকে গৌরবের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে উৎখাত করা হয়েছে। একেও (ট্রাম্প) উৎখাত করা হবে।’ এর আগে, তেহরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায় তবে তারা পাল্টা জবাব দেবে।

ইরানে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ গ্রহণযোগ্য নয়- চীন : সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সামরিক পদক্ষেপ ঘোষণার পর ইরানকে হুমকি ছুঁড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিদেশি শক্তির এই হুমকি গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে চীন। সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং ট্রাম্পের মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা সবসময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে সহায়ক— এমন কাজ আরও বেশি করে করার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।’ ইরানি কর্তৃপক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। গত রোববার এক বিবৃতিতে তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি ব্যবহার এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। খবর আনাদোলু এজেন্সির। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে জানান, ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং এর ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির খবরে মহাসচিব স্তব্ধ। গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার এবং সংগঠনের অধিকার অবশ্যই পূর্ণরূপে রক্ষা করতে হবে। প্রত্যেক ইরানি নাগরিক যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের অভিযোগ বা দাবিগুলো শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারেন, সরকারকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে, ইরানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতিসংঘপ্রধান। তিনি দেশটিতে ইন্টারনেটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করার পদক্ষেপ নিতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

ইরানের স্বাধীনতা আসন্ন, শিগগিরই আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া যাবে: ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে এক পোস্টে বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা আসন্ন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘গত দুই সপ্তাহে, বিশেষ করে গত চার দিনে, আপনারা দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভের মাধ্যমে অবৈধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন।

তিনি লেখেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে এবং আমাদের প্রিয় ইরানকে পুনরুদ্ধারে আমি জাতীয় অভ্যুত্থানের একটি নতুন পর্ব ঘোষণা করছি। ‘ইরানের স্বাধীনতা আসন্ন। আমরা একা নই। শিগগিরই আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া যাবে।’

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ এরই মধ্যে দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত