
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জোটের পক্ষ থেকে এ আসন সমঝোতার ঘোষণা দেন। ঘোষণা অনুযায়ী- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৭৯, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২ ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি ২। এর বাইরে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জন্য আসন চূড়ান্ত করা হয়নি। চূড়ান্ত হয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আসন সমঝোতার বিষয়টিও। ফলে ৪৭টি আসন সমঝোতা আটকে থাকছে।
জোটের আসন সমঝোতা ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর বলেন, ‘আমরা জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণে একত্রিত হয়েছি। আমরা আর পুরনো রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না। আমরা চাঁদাবাজি-খুনের রাজনীতি আর দেখতে চাই না। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা যারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন তারাই এখানে সমবেত হয়েছেন।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘কারচুপি-ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হব। আমরা সবাইকে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও ভোটের হিসাব নেওয়ার অনুরোধ করছি। আজকের এই ঐক্যের পেছনে অনেকের অবদান রয়েছে। আমরা সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদমুক্ত একটা নতুন দেশ গড়ার মাধ্যমে তাদের ঋণ পরিশোধ করতে চাই।’
শরিফ ওসমান বিন হাদি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাদি ছিলেন নিজেই একটা বিপ্লব। আমরা তার হত্যার বিচার চাই। তিনি যদি বিচার পান তাহলে আরও অনেকেই দেশের জন্য এগিয়ে আসবেন। আর যদি বিচার না হয় তাহলে এ দেশে আর কোনো বিপ্লবী জন্ম নেবে না।’ জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পর আসন সমঝোতার ঘোষণা দেন দলটির নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, কিছু আসনে ঝামেলা হয়েছে, এটি প্রত্যাহারের পর ঠিক হবে।
নির্বাচনে ১১ দল ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ করব - মামুনুল হক : বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসন ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ১১টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সমঝোতায় ৩০০ আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মামুনুল হক বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন বিরোধী আন্দোলন, ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে প্রতিবাদী জনতার ওপর হামলা এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এসব শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা ও তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই ঐক্যের ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যা আন্দোলনকারীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’, সেই গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ ও সফলতার অভিজ্ঞতা লাভ করে। সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলন এবং নির্বাচনি ঐক্যের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মামুনুল হক বলেন, এই রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা, অভিপ্রায় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে দলগুলো অনেক আগেই একসঙ্গে পথচলা শুরু করে। জুলাই সনদের আইনিভিত্তি বাস্তবায়নকে অভিন্ন লক্ষ্য ধরে ধাপে ধাপে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১১টি দল এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব- নাহিদ ইসলাম : সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সারাদেশে আমাদের দলের পক্ষে কোনো একক প্রার্থী থাকবে না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ থেকে আমরা ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সংস্কারের পক্ষে থাকা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে থাকা, আজাদির পক্ষে থাকা অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একটা প্ল্যাটফর্মে এসেছে। যেখানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে আমরা অংশগ্রহণ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও ঐতিহাসিক যাত্রা। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সবার অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা যে জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চাইছি, এই ঐক্য তা বাস্তবায়নে পরিপূর্ণ সহায়ক হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনি সমঝোতা বা ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে সারাদেশে প্রার্থী দেবে। আমরা সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব এবং আমাদের যে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ, সেটার বাস্তবায়ন ঘটবে। জনগণের পক্ষে এবং আজাদির পক্ষে এই নির্বাচনের ফলাফল ঘরে তুলব, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চাঁদ, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমাদ আব্দুর কাদের, জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির আনোয়ারুল হক, সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রমুখ।