ঢাকা শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ অনুমোদন

* কয়েক দিনের মধ্যেই গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আইনে পরিণত হবে : আইন উপদেষ্টা * জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা থাকলে তা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেবে সরকার
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ অনুমোদন

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশের’ অনুমোদন দেওয়া হয়।

ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা আগেই ঘোষণা করেছিলাম, এটা আমাদের জুলাই গণঅভুত্থানকারীদের প্রতি কমিটমেন্ট ছিল। জুলাই গণভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ আজকে (বৃহস্পতিবার) কেবিনেটে অনুমোদিত হয়েছে। এটা আশা করি আগামী পাঁচ সাত দিনের মধ্যে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আইনে পরিণত হবে।

আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এখানে মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলী থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে আমরা বুঝিয়েছি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত যেসব কার্যাবলী ছিল, সে সব কার্যাবলীর ফৌজদারী দায়-দায়িত্ব থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটা হচ্ছে জুলাই এবং আগস্টে সংগঠিত কার্যাবলী।’

জুলাই ও আগস্টের সময়কালে সংঘটিত কার্যাবলী থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এরই মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা থাকলে, সে মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেবে সরকার। এছাড়া এখন থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা করা যাবে না। তবে জুলাই ও আগস্টে রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে ব্যক্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকলে সে ফৌজদারি মামলা থেকে রেহাই পাবে না।

আইন উপদেষ্টা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যদি কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, যেটার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থান সম্পৃক্ত নয়, লোভের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ও সংকীর্ণ স্বার্থে হত্যাকাণ্ড ঘটায়, এ আইনের মাধ্যমে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। এই আইনটি তাদের জন্য করা হয়নি। আইনটি করা হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংঘটিত কার্যাবলীর ক্ষেত্রে। সে কার্যাবলীতে যারা সমন্বিতভাবে জড়িত ছিল, তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

আইন উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কয়েকটা জিনিস লক্ষ্য করবেন, আমি বারবার রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে শব্দটা ব্যবহার করছি। জুলাই এবং আগস্ট মাসে রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে কেউ যদি ব্যক্তিগত এবং সংকীর্ণ স্বার্থে বা লোভের বশবর্তী হয়ে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তবে সে এই দায়মুক্তির আওতায় আসবে না। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা সংকীর্ণ স্বার্থে করা কোনো অপরাধের ফৌজদারি দায় থেকে অপরাধী রেহাই পাবে না। এই আইন শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে কালেক্টিভলি (সামষ্টিকভাবে) জড়িতদের জন্য।’

কোন অপরাধটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ আর কোনটি ব্যক্তিগত স্বার্থে হয়েছে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। আসিফ নজরুল বলেন, ‘কোনও ভিকটিম পরিবার যদি মনে করে তাদের স্বজন ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তবে তারা মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন তদন্ত করে যদি দেখে এটি ব্যক্তিগত স্বার্থে হয়েছে, তবে সেই রিপোর্ট পুলিশের রিপোর্টের মতো গণ্য হবে এবং বিচার চলবে। আর যদি দেখা যায় এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়ায় ঘটেছে, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি দায়মুক্তি পাবেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দায়মুক্তি বিষয়ে এ ধরনের অধ্যাদেশের নজির যেমন রয়েছে, তেমনি সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে এর সাংবিধানিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও সারা পৃথিবীতে এি ধরনের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান, তবুও কেউ হয়তো অসৎ উদ্দেশ্যে বা আইনগতভাবে একে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তবে আমাদের বিশ্বাস, এই চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত টিকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালেও মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি আইন করা হয়েছিল। তবে সেই আইন ১৯৭২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সংজ্ঞা ও জুলাই সনদকে বিবেচনায় রেখে দায়মুক্তির সময়সীমা শুধুমাত্র জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে কয়বার দায়মুক্তি দিয়ে আইন ও অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়পর্বের ঘটনার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, জুলাই যোদ্ধাদের সেভাবেই দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৪ জানুয়ারি তিন দফা দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। একটি সূত্র জানিয়েছে, এ দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলা ও গ্রেপ্তার না করতে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর একটি বিবৃতি দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তখন বলা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে ছাত্র-জনতা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের মাঠে থেকে কাজ করেছে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলির আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ অনুমোদন দিয়েছে। এই অধ্যাদেশের আওতায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে’ সংগঠিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্টরা দায়মুক্তি পাবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত