
ক্রিকেটারদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে সব ধরনের ক্রিকেট বয়কট করছে ক্রিকেটার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। প্রথম ম্যাচের আগেই তারা জানিয়ে দেন, দাবি পূরণ না হলে সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবেন। নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করায় সেই সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন ক্রিকেটাররা, ফলে তারা আর মাঠে নামেননি। গতকাল বৃহস্পতিবার বনানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেন কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন। এ সময় জাতীয় দলের টেস্ট ফরম্যাটের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস ও নুরুল হাসান সোহানসহ জাতীয় দলের শীর্ষ ক্রিকেটাররা। ফলে এদিন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে, নির্ধারিত সময়ে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গেট খোলা হলেও দুপুর ১টার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে স্টেডিয়ামের গেটগুলোর বাইরে ভিড় করা দর্শকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে দায়িত্ব থেকে নাজমুলকে অব্যাহতি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম অর্থ কমিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন।
জানা গেছে, চলতি বিপিএলে বৃহস্পতিবার ঢাকা পর্বের প্রথম দিনে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের। কিন্তু গত বুধবার বিসিবি পরিচালক নাজমুল ইসলামের ক্রিকেটারদের কটূক্তি করার অভিযোগে কোয়াবের বয়কটে শামিল হয়ে মাঠেই আসেনি কোনো দল। এতে নির্ধারিত সময়ে শুরু হয়নি ম্যাচ। এ ঘটনায় নাজমুল ইসলামকে শোকজ করেছে বিসিবি। তবে, নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ ছাড়া সবধরনের খেলা বয়কটের ডাক দিয়েছে কোয়াব। আর দাবি মানার আগে মাঠে নামবেন না ক্রিকেটাররা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি বলেছে, ‘সম্প্রতি এক বোর্ড সদস্যের আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য আবারও দুঃখপ্রকাশ করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। উদ্বেগের বিষয়টি জেনে বিসিবি পেশাদারিত্ব, ক্রিকেটারদের প্রতি সম্মান ও ক্রিকেটের মূল্যবোধ লালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্ব নিয়মণ্ডনীতি ও পেশাদার বিধি অনুসারে বিসিবি কঠোরভাবে এসব বিষয় মোকাবিলা করবে।’
পরিচালক নাজমুল ইসলামকে শোকজ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বিসিবি জানিয়েছে, ‘ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক কার্যক্রম হিসেবে ওই বোর্ড সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এরপরই এই বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
খেলা বয়কটের দাবি জানানো ক্রিকেটারদের প্রতি বিসিবির আহবান ‘বিপিএলের ২০২৬ আসর শেষ পর্যায়ে। দেশের জনপ্রিয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট ও বিদেশি সমর্থকদের কাছে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বিসিবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, খেলোয়াড়রাই বিপিএল এবং বোর্ডের অধীন যেকোনো ক্রিকেটীয় কার্যক্রমের প্রধান স্টেকহোল্ডার এবং প্রাণশক্তি। তাই বোর্ডের প্রত্যাশা- ক্রিকেটাররা বিপিএলের বাকি অংশ সফলভাবে সম্পন্ন করতে তাদের পেশাদারিত্ব এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।’
এর আগে বিশ্বকাপ না খেললে বিসিবি থেকে ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার বিসিবি পরিচালক নাজমুল বলেন, ‘বিসিবির ক্ষতি হবে না, ক্রিকেটারদের ক্ষতি হবে। কারণ ক্রিকেটাররা খেললে ম্যাচ ফি পায়। ম্যাচসেরা হলেও পারফরম্যান্স অনুযায়ী পায়। এটা শুধুই ক্রিকেটারদের পাওয়া। বোর্ডের লাভণ্ডক্ষতি নেই। অন্তত এই বিশ্বকাপের জন্য। ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, আমরা যে ওদের পেছনে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি?’
গতকাল বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, ক্রিকেট অপরারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু মাঠের ভেতরে ঘুরে গেছেন, নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলোচনাও করেন।
দুপুর ১২টায় খোলা হয় দর্শকদের প্রবেশ গেট। তবে ঘণ্টাখানেক পরই সব গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২ নম্বর গেটের সামনে দেখা যায় দর্শকরা ভিড় করেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ মাটিতে বসে পড়েন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। ১, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গেটেও একই দৃশ্য। টিকিট হাতে দর্শকরা গেটের বাইরে জড়ো হন। তবে প্রত্যেক গেটই একদম চূড়ান্তভাবে বন্ধ করা হয়। সাজিদ নামের ২৬ বছর বয়সী এক দর্শক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কোনো কথা...এত কষ্ট করে খেলা দেখতে এসেছে কিন্তু এভাবে কিছু না জানিয়ে হুট করে বন্ধ করাটা সত্যিই দুঃখজনক।’ আবিদ নামের আরেকজন বলেন, ‘দর্শকদের কোনো মূল্য নেই এদের কাছে। এরা এদের মতো করে চলে দর্শকদের কথা ভাবে না।’ সব গেটের ভিতরেই নিরাপত্তা বাড়ায় বিসিবি। বিসিবি মেইন গেটে নিরাপত্তা সদস্যরা সারি হয়ে দাঁড়ান। পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য রাখা হয়।
বিসিবির টাকা এসেছে ক্রিকেটারদের শ্রমে ঘামে- মিরাজ : বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটা হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, প্রথমে তামিম ইকবালকে ‘ভারতের দালাল’ বলা, তারপর ক্রিকেটারদের টাকার খোঁটা দেওয়া বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে ধর্মঘট পালন করছেন ক্রিকেটাররা। এজন্য আজকের (বৃহস্পতিবার) বিপিএল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচটাও বাতিল হয়েছে। এমতাবস্থায় সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেছেন ক্রিকেটাররা।
মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, ‘একটা জিনিস ক্লিয়ার করা উচিত। আমরা খারাপ খেললে অনেকেই বলে আপনারা খারাপ খেলতেছেন আমাদের টাকায়তো আপনারা চলেন, আমরা টাকা দেই বলেইতো আপনারা খেলছেন। জিনিসটা আসলে এরকম না। আমরা যেই টাকাটা আয় করি তার সর্বোচ্চটা আইসিসি এবং স্পনসর থেকে আসে।’ মিরাজ আরও বলেন, ‘আজকে ক্রিকেট বোর্ডের যেই টাকাটা আছে আমার কাছে মনে হয় যারা জাতীয় দলে প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত খেলছে তাদেরও এখানে একটা অংশ আছে। মাঠে খেলা হচ্ছে বলেই বোর্ড ভালো জায়গায় আছে। খেলাই যদি না হয় স্পন্সরও আসবে না, আইসিসি থেকে লভ্যাংশও আসবে না। প্রত্যেকটা মানুষের জানা উচিত যে আমরা কিন্তু সরকারকে ট্যাক্স দেই, এবং আমরা যে টাকা পাই সেটা সরকার দেয় না। সেটা স্পন্সর এবং আইসিসি থেকে আসে।’ ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, ‘আমরা অবশ্যই খেলতে চাই, তবে আমাদের দাবীগুলা মানার পরে। বিসিবি থেকে সুষ্ঠু সমাধান হলে, আমরা অবশ্যই মাঠে যাব। আমরা খেলার বিপক্ষে না। কিন্তু সবকিছুর তো একটা লিমিট আছে। এখানে শুধু আমার না, পুরো ক্রিকেট অঙ্গনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সবাইকে অপমান করা হয়েছে।’