
বদরযুদ্ধ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইসলাম বলতে ঈমান নামাজ রোজা যেমন বুঝায়, তেমনি বদর, উহুদ, খন্দক, খায়বার প্রভৃতি যুদ্ধও ইসলামের অঙ্গ। এসব যুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় যে, কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। এ কারণে কোরআন মজিদের সূরা আনফালে দীর্ঘ ৬০ খানা এবং সুরা আলে ইমরানে ৫টি আয়াতে বদরযুদ্ধের খুঁটিনাটি সববিষয় আলোচনা হয়েছে। কাজেই ইসলামকে জানতে হলে, কোরআন বুঝতে হলে বদর পড়তে হবে, বদরকে বুঝতে হবে।
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরি ২য় সালের পবিত্র রমজান মাসে। নবুওত লাভের পর মক্কায় তের বছর নির্যাতিত জীবন শেষে মুসলমানরা মদীনায় এসেছেন বেশি দিন হয়নি; মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে হযরত এখনও শিশুরাষ্ট্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেননি। রাতের আঁধারে ঘর থেকে বের হয়ে গোপনে দুর্গম পথ বেয়ে নবীজি তাদের সাঁড়াশি আক্রমণের হাত থেকে কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে মদীনায় এসেছেন।
ওদিকে মক্কার কুরাইশ নেতারা- যারা তাকে হত্যা করে ইসলামের নামচিহ্ন মুছে ফেলার ফন্দি এঁটেছিল, তারাও বসে নেই। হিযরতের পর মদীনায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ছিল কুরাইশদের জন্য বড় রকমের হুমকি। এরইমধ্যে ছোটখাটো অভিযানে কাফেরদের বিরুদ্ধে নবীজি শক্তিমত্তার কয়েকটি স্বাক্ষরও রেখেছেন। তাই মক্কার কুরাইশ নেতাদের মনে মদীনাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। হযরতও সদা সতর্ক, সন্ত্রস্ত ছিলেন কুরাইশদের যে কোনো হামলার আশঙ্কায়। কাফেরদের গতিবিধি ও শক্তি সঞ্চয়ের ওপর তার নজরদারি ছিল শক্ত ও কড়া। এহেন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই বদরযুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি চিন্তা করছিলেন শত্রুর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে না দিতে পারলে যে কোনো সময় হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেকে বদরযুদ্ধকে রাসূলে পাকের আত্মরক্ষার যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন; কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হল, এ যুদ্ধ প্রথম আরম্ভকারীর ভূমিকায় ছিলেন মুসলমানরা। কুরাইশরা ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্ত করে মদীনা আক্রমণ করতে পারে- এ আশঙ্কার বিরুদ্ধে রাসূলে পাকের (সা.) আগাম প্রতিরোধ ছিল এ যুদ্ধ। কাফেরদের অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয়ে বাধাদান করাই ছিল আসল লক্ষ্য। এজন্যই কুরাইশ বণিজ্য কাফেলা সিরিয়া যাওয়ার আগেই রাসূল পাক একবার আক্রমণ রচনা করেন তাদের বাধা দানের উদ্দেশ্য।
যুল ওশাইরার যুদ্ধ : হিযরতের ১৬তম মাস জমাদিউল আখের- এ ‘যুল-ওশাইরা’ যুদ্ধ পরিচালিত হয়। হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) এ যুদ্ধের পতাকা বহন করেন। পতাকার রং ছিল সাদা। নবীজি (সা.) আবু সালমা ইবনে আবদুল আসাদ মাখ্যুমীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত রেখে যান।
নবীজি (সা.) দেড়শ’ লোক মতান্তরে ২০০ লোক সঙ্গে নিয়ে অভিযানে বের হন। সবাই ছিলেন মুহাজির ও স্বেচ্ছাসেবী। কাউকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয়নি। মোট ৩০টি উট ছিল সঙ্গে। পালাক্রমে সওয়ার হতেন তারা। এ অভিযানে নবীজির (সা.) লক্ষ্য ছিল, সিরিয়াগামী কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলা আটক করা। যুল-ওশাইরা এলাকায় পৌঁছে হযরত জানতে পারলেন, কাফেলা কয়েক দিন আগেই এলাকাটি অতিক্রম করে চলে গেছে। এলাকাটি ছিল ‘ইয়ান্বা’ অঞ্চলে বনি মুদলাজের মালিকানাধীন জমাজমি। এই কাফেলা যখন সিরিয়ায় বাণিজ্য শেষে ফিরছিল তখন হযরত (সা.) পুনরায় এর গতিরোধের চেষ্টা করেন এবং ফলশ্রুতিতে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এভাবে, রাসূলে পাক-সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম শুনতে পেলেন, কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে আবু সুফিয়ান সিরিয়া হতে ফিরছে; নবীজির গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী ছিল। হযরত (সা.) মুসলমানদের প্রতি যুদ্ধযাত্রার আহ্বান জানিয়ে বললেন : কুরাইশ কাফেলা বাণিজ্যের মালপত্র সঙ্গে নিয়ে ফিরছে, তোমরা এর গতিরোধ কর; হয়তো আল্লাহ্ এর মালপত্র তোমাদের ভাগ্যে জুটাবেন। আবু সুফিয়ান সিরিয়া হতে ফেরার পথে হেজাজভূমির নিকটবর্তী হলে সংবাদ সংগ্রহে তৎপর হয়। বাণিজ্য কাফেলার ব্যাপারে বড়ই শংকিত ছিল সে। কোনো কোনো মুসাফির তাকে সংবাদ দেয় যে, মুহাম্মদ বাণিজ্য কাফেলা আটক করার জন্য তার সাথীদের সংগঠিত করেছেন। আবু সুফিয়ান বিচলিত হয়ে পড়ে। তৎক্ষণাৎ যামযাম ইবনে আমার গাফফারীকে বেতন দিয়ে সংবাদবাহক নিয়োগ করে তাকে হুকুম দেয় যে, মক্কায় গিয়ে বাণিজ্য কাফেলা রক্ষার জন্য কুরাইশদের সংগঠিত কর আর তাদের জানিয়ে দাও যে, মুহাম্মদ তার সাথীদের নিয়ে কাফেলা আক্রমণ করতে চায়। কুরাইশের নেত্রীস্থানীয় লোকেরা দ্রুত রণপ্রস্তুতি নিয়ে রওনা হলো। কেউ কেউ নিজের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রেরণ করল। কুরাইশ নেতাদের মধ্যে আবু লাহাব ইবনে আবদুল মুত্তালিব ব্যতীত আর কেউ বাদ থাকেনি। আবু লাহাব নিজের পরিবর্তে আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাকে প্রেরণ করে। তার কাছে চার হাজার দেরহাম পাওনা ছিল। এর বিনিময়ে তাকে ভাড়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠায়।