
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ফাঁকা সড়কে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৬৪ জন। গত শনিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী বাসকে মেইল ট্রেন ধাক্কা দিলে নারী-শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত ২০ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী মামুন পরিবহনের বাসটি ভোররাতে ক্রসিং পার হওয়ার সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তিনজন গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আঞ্জুরা এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান খাদে পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে এক নারী ও তিনজন পুরুষ রয়েছেন। স্থানীয়দের ধারণা, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বা অন্য কোনো গাড়ির ধাক্কায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফেনীর রামপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক সংস্কারকাজ চলাকালে ধীরগতির অ্যাম্বুলেন্সকে পেছন থেকে বাসের ধাক্কা এবং পরবর্তীতে আরও একটি বাসের সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হন। এতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষ ঘটে। বান্দরবানের সুয়ালকে পাহাড়ি সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বাসটিতে ৪৩ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই পর্যটক। আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নওগাঁর রাণীনগরে ভটভটি উল্টে পুকুরে পড়ে এক কিশোর নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। ঈদের আনন্দ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
লালমনিরহাটে বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
পাবনার ঈশ্বরদীতে বিয়ের আগের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় জুলফিকার ইসলাম জিল্লু নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। দাওয়াত দিতে যাওয়ার পথে তার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই বন্ধু নিহত এবং আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
কক্সবাজারের টেকনাফে পিচ্ছিল সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারানো মোটরসাইকেলের সঙ্গে পর্যটকবাহী জিপের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা থাকায় অতিরিক্ত গতি, অনিয়ন্ত্রিত চালনা এবং চলমান সড়ক সংস্কারকাজ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত : যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিন সদস্য। গত সোমবার রাত আড়াইটার দিকে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের গাইদঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ফাতেহাবাদ গ্রামের মজিদ সরদার (৭০), তার ছেলে মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি (৪৩) ও জনির মেয়ে সেহেরিশ (৪)। আহতরা হলেন- জাকারিয়ার স্ত্রী, ছেলে ও মা। আহতদের ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাতে চুয়াডাঙ্গা থেকে ছেড়ে আসা প্রাইভেটকারটি গন্তব্যে ফিরছিল। গাইদঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছলে চালক হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। দ্রুতগতির গাড়িটি রাস্তার পাশের একটি বড় বটগাছে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে গাড়িটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান। খবর পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও একজনের মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে ধারণা, গভীর রাতে অতিরিক্ত গতির কারণে অথবা চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
বারবাজার হাইওয়ে থানার (এসআই) জাহিদ বলেন, মরদেহ যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছে। কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত, আহত চার : নাটোরের লালপুর উপজেলার নবীনগর গ্রামে ট্রাকচাপায় ইজিবাইকের চালকসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত চারজন যাত্রী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে লালপুর-ঈশ্বরদী সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত তিনজন হলেন ইজিবাইকের চালক বাবুল হোসেন, যাত্রী জাহিদুল ইসলাম ও মনিরুল ইসলাম। তারা উপজেলার দুডদুডিয়া ইউনিয়নের ছোটবাদকয়া গ্রামের বাসিন্দা।
লালপুর থানা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চালক বাবুল হোসেন ছয়জন যাত্রী নিয়ে সকালে লালপুর থেকে ঈশ্বরদীর উদ্দেশে রওনা হন। পথে নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাক তার ইজিবাইকটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চালকসহ দুজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর ট্রাকের চালক ও সহকারী পালিয়ে যান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কিশোরগঞ্জে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল দুইজনের : কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পৃথক ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব দিকের আউটার সিগনাল এলাকায় ও গত সোমবার রাতে স্টেশনের পশ্চিম আউটারে এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, দুপুর ১২টার দিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব দিকের আউটার সিগনাল এলাকায় রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময় সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনী এক্সপ্রেসের নিচে কাটা পড়েন। কন্ট্রোল থেকে খবর পেয়ে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। নিহতের পরিচয় শনাক্তে জেলা পিবিআইকে খবর দেয়া হয়েছে। নিহত যুবকের পরনে জিন্সের প্যান্ট ও একটি খয়েরি শার্ট ছিল। এদিকে গত সোমবার রাতে স্টেশনে পশ্চিম আউটার এলাকায় তিতাস কমিউটার ট্রেনে কাটা পড়ে মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি মারা যান। পিবিআই তার পরিচয় শনাক্তের পর তার স্বজনদের খবর দেয়া হলে তারা এসে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সকালে মরদেহ নিয়ে যান। তিনি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় তার বাড়ি।
এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক দিদার হুসেইন বলেন, ‘আজ (গতকাল) বেলা ১২টার দিকে ঢাকাগামী ‘কালনী এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত পরিচয়ে এক ব্যক্তি মারা যান। খবর পেয়ে তার লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি। পিবিআইকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা এসে পরিচয় শনাক্ত করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘সোমবার রাতে স্টেশনের পশ্চিম পাশে ট্রেনে কাটা পড়ে মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি মারা যান। আমরা পিবিআইয়ের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করি। পরে তার স্বজনরা এসে তার লাশ নিয়ে যান।’
রাজধানীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় কিশোরীসহ দুইজন নিহত : রাজধানীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এক কিশোরীসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- পশ্চিম রামপুরার অনিকা তাহসিন (১২) ও গাবতলীর মো. জীবন (৪০)। ঘটনা দুইটি ঘটেছে গত সোমবার রাতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে।
পশ্চিম রামপুরা এলাকার দুর্ঘটনায় জানা গেছে, হাতিরঝিল থানাধীন পশ্চিম রামপুরা ডিআইটি রোডের পলাশবাগ মোড়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো ১২ বছর বয়সী অনিকা তাহসিন। এ সময় একটি প্রাইভেটকার ইউটার্ন নিতে গিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। আহত কিশোরীকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে তার মৃত্যু হয়। এদিকে, উত্তেজিত জনতা গাড়িটিকে আটক করে ভাঙচুর করেন। অনিকা তাহসিন পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানি উপজেলার প্রত্যাশি গ্রামের মো. সিদ্দিকুর রহমান ও আছিয়া বেগমের মেয়ে। বর্তমানে পূর্ব রামপুরার ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতো। অন্যদিকে, গাবতলী এলাকার দুর্ঘটনায় জানা যায়, একই রাতে দারুসসালাম থানাধীন গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় রাস্তা পার হচ্ছিলেন পথচারী মো. জীবন (৪০)। এ সময় দ্রুতগতির একটি মোটর সাইকেলের ধাক্কায় তিনি গুরুতর আহত হন। প্রতিবেশী সাজু তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর রাত ১২টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মো. জীবন নীলফামারী সদর উপজেলার মো. আব্দুল গফুরের ছেলে। বর্তমানে মিরপুরের কাউন্দিয়া এলাকায় বসবাস করতেন এবং অসিম পরিবহনের বাসের চালক ছিলেন।