ঢাকা বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আলোচনার কথা বললেন ট্রাম্প ‘যুদ্ধে জবাব দেবে’ ইরান

আলোচনার কথা বললেন ট্রাম্প ‘যুদ্ধে জবাব দেবে’ ইরান

ইরান ইস্যুতে আবারও নীতিগত দোলাচলে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক হামলা স্থগিত করলেও এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা তার জন্য সহজ নাও হতে পারে- এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।

একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ১৫টি পয়েন্টে অগ্রগতি হয়েছে। তবে ইরান এ ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও তা থামানো কঠিন। বিশেষ করে, এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য উত্তেজনাও বড় আকার নিতে পারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়ে ইরান এরইমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান কিছুটা ‘ডি-এসকেলেশন’ বা উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দেয়। তবে তার বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে তিনি শান্তির কথা বলছেন, অন্যদিকে হামলার প্রস্তুতি বজায় রেখেছেন। এ কারণে তার ঘোষণাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক কারণও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার ঘোষণার পর শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রধান সূচকগুলো এক শতাংশের বেশি বেড়েছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক তেলের দামও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প সময় কিনতে চাইছেন। কারণ, সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। খার্গ আইল্যান্ড বা হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলের মতো অভিযান চালাতে আরও সময় লাগতে পারে।

তবে ইরানের অবস্থানও কঠোর। দীর্ঘ হামলার পর দেশটি আরও আপসহীন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষয়ক্ষতির পর কঠোরপন্থীদের প্রভাব বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে সম্ভাব্য আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শর্তগুলোও বড় বাধা। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ত্যাগের দাবি তেহরানের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক হামলা তাদের এমন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে দেখিয়েছে। এদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ট্রাম্পের সামনে বিকল্পগুলোও সীমিত হয়ে পড়ছে। হামলা বাড়ালে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হতে পারে। স্থলবাহিনী মোতায়েন করলে তা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আবার হঠাৎ করে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালে মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এমন এক সংকটে পড়েছেন, যেখানে সহজ কোনো সমাধান নেই। যুদ্ধ চালানো বা থামানো দুটোই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, মার্কিন বাহিনীকে অচল করে দেওয়ার হুমকি ইরানের : জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলা চালালে মার্কিন বাহিনীকে ‘অচল’ করে দেওয়া হবে ও আরব উপসাগরে তাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল মঙ্গলবার ইরানি সেনাবাহিনীর এই অভিজাত শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মহসেন রেজায়ি এই হুমকি দেন। ইরানের প্রভাবশালী এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য রেজায়ি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে ও এই ‘জটিল পরিস্থিতি’ থেকে দেশটিকে উদ্ধার করার জন্য খুব বেশি সময় আর অবশিষ্ট নেই। এদিকে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি থেকে সরে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে তেহরান। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চলমান হামলার অংশ হিসেবে জায়নবাদী ও মার্কিন শত্রুরা ইসফাহানের কাভেহ স্ট্রিটে অবস্থিত গ্যাস প্রশাসনিক ভবন এবং গ্যাস চাপ নিয়ন্ত্রণ স্টেশনকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, মধ্য ইরানের এসব স্থাপনা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের খোররামশাহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস পাইপলাইনেও হামলা চালানো হয়েছে।

‘যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা হয়নি, ইরানের চোরাবালিতে আটকা পড়েছেন ট্রাম্প’ : ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ‘অত্যন্ত ভালো এবং ফলপ্রসূ কথোপকথন’ হয়েছে বলে দাবি করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তারা এই অস্বীকৃতি জানান। গত সোমবার একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।’ এক্সের পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের চোরাবালিতে আটকা পড়েছে। তা থেকে বাঁচতে ‘ফেক নিউজ’ ব্যবহার করছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে। গালিবাফ আরও বলেন,ইরানি জনগণ আগ্রাসনকারীদের সম্পূর্ণ এবং অনুশোচনামূলক শাস্তি দাবি করে। এই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সব কর্মকর্তা তাদের সর্বোচ্চ নেতা এবং জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

বাঁচার জন্য ঐকমত্যের মিথ্যা দাবি করছেন ট্রাম্প- ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ও ঐকমত্য পৌঁছানোর কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে ইরান। এমনকি, তেহরানের দাবি, ‘বাঁচার জন্য’ ঐকমত্যের ‘মিথ্যা’ দাবি করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই মন্তব্য করেছে।

এর আগে সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, গত রোববার ইরানের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে। আর এই আলোচনার জন্য ইরানই প্রথমে যোগাযোগ করেছিল। এ বিষয়ে ট্রাম্প নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছেও একই দাবি করেন। ফ্লোরিডার একটি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বেশ জোরালো আলোচনা হয়েছে ও দুপক্ষ ‘গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান বিষয়ে একমত’ হতে পেরেছে। রোববার হওয়া আলোচনা সোমবারও অব্যাহত থাকবে।

ট্রাম্প বলেন, আমাদের মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয়ে ঐকমত্যের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এমনকি, প্রায় সব বিষয়ে আমরা একমত হতে পেরেছি। দেখা যাক, এগুলো কোন দিকে নিয়ে যায়। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান একটি চুক্তি করতে খুব আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রও একটি চুক্তি করতে চায়। তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। চুক্তি না হলে ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান ট্রাম্প।

এদিকে, ইরানের ঠিক কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, সেটি জানাননি ট্রাম্প। তবে তিনি জানান, এই আলোচনায় ইরানের একজন ‘শীর্ষ পর্যায়ের সম্মানিত নেতা’ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে ট্রাম্প জানান, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কিছু জানতে পারেনি। মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। তিনি মোজতবা খামেনির মৃত্যু কামনা করেন না বলেও মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের এসব দাবির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতে মিথ্যা খবর ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের এসব দাবির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতে মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

দ্বিতীয় একটি পোস্টে গালিবাফ লেখেন, ইরান ‘আগ্রাসনকারীদের পূর্ণাঙ্গ ও অনুশোচনামূলক শাস্তি’ দাবি করে। এই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে তাদের সর্বোচ্চ নেতা ও জনগণের পাশে রয়েছেন। গালিবাফের পোস্টের আগে এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খবরটি অস্বীকার করেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে তেহরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ইসরায়েলে আবার ইমাদ ও কদর ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি নামাল ইরান : যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করার পর আবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি নামাল তেহরান। গতকাল মঙ্গলবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের চলমান প্রতিশোধমূলক ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৭৮তম ধাপের ঘোষণা দিয়েছে।

নতুন দফায় ইসরায়েলের ডিমোনা, তেল আবিব ও ইলাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি অভিযানের এই সর্বশেষ পর্যায়কে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জানায়, যখন জাতি ‘মুষ্টিবদ্ধ হাতে’ লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি ব্যাপক সমর্থন জানাচ্ছে, ঠিক তখনই শত্রুর লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষিত হয়েছে।

একটি অনন্য রেকর্ড : বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সর্বশেষ পর্যায়টি ‘যুদ্ধের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছে’। বিবৃতি অনুযায়ী, দখল করা ইলাত বন্দর, সুরক্ষিত শহর ডিমোনা (যেখানে ইসরায়েলি শাসকের কুখ্যাত পারমাণবিক চুল্লি অবস্থিত) এবং উত্তর তেল আবিবের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ইমাদ এবং মাল্টি-ওয়ারহেড কদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং অ্যাটাক ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ডিমোনাতে আঘাত হানল। এর কয়েক দিন আগেই তারা একটি পাল্টা হামলা চালিয়েছিল, যা অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে ভীতির সঞ্চার করেছিল। ওই হামলায় ডিমোনা এবং এর পাশের শহর আরাদে ২০০-এর বেশি মানুষ হতাহত হয়েছিল। আইআরজিসি আরও জানায়, তাদের অভিযানের ৭৮তম পর্যায়ে এ অঞ্চলে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

আঘাত-নির্ভর অভিযান : বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, আইআরজিসি এই ঘৃণ্য ও শিশু হত্যাকারী আগ্রাসনকারীদের সঙ্গে আঘাত-নির্ভর অভিযানের মাধ্যমে কথা বলছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইআরজিসির অধিকাংশ কমব্যাট ইউনিট এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের লাখ লাখ বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেনি। সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, তাদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ সংঘাতকে আরও তীব্র করবে এবং আগ্রাসনকারীদের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলবে। আইআরজিসি আরও সতর্ক করেছে যে, প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে পরাজয় কাটিয়ে ওঠার বা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা নজরে রাখা হবে। এতে বলা হয়েছে যে, যেকোনো পর্যায়ের আগ্রাসনের পরিকল্পনাকারী, বাস্তবায়নকারী এবং সমর্থকদের ওপর ইরানের ‘তীব্র আঘাত’ অত্যন্ত দ্রুত নেমে আসবে। গত মাসের শেষের দিকে ইরানবিরোধী সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ার পরপরই ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’ শুরু হয়।

ইরানের মিসাইল দেখে দৌড়ে পালালেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট : ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে গণহত্যাকারী ইসরায়েল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করার পর থেকে নিস্তার পাচ্ছে না ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। কঠোরহস্তে পালটা হামলা করে যাচ্ছে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেশ। এতে প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি। এর মধ্যেই ঘটে গেছে আরেক কাণ্ড; ইরানের মিসাইল দেখে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের দৌড়ে পালানোর দৃশ্য সম্বলিত একটি ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছে। গত সোমবার উত্তর ইসরায়েলের কিরিয়াত শমোনা শহরে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন অবৈধ এ ভূখণ্ডের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করতেই ওই এলাকায় আঘাত হানে ইরানের একটি শক্তিশালী মিসাইল। সেই ক্ষেপণাস্ত্র দেখে সাংবাদিকদের রেখেই দৌড়ে পালান হারজগ। দ্রুত তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায় তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনে হারজগ বলেন, ইসরায়েল গত বছরের যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যেতে পারে না এবং তাদের অবশ্যই লেবাননের ভেতরে ‘কৌশলগত গভীরতা’ নিশ্চিত করতে হবে। ইরানের মিসাইলের আঘাতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায় না। এতে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাঝে মধ্যে পরিদর্শনে যান প্রেসিডেন্ট হারজগ। কিরিয়াত শমোনা শহরে সেরকমই একটি সফর শেষে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন তিনি। ওই সময় সেখানে আঘাত হানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র।

ইরানের সরকার পতনে ব্যর্থ মোসাদ, হতাশ নেতানিয়াহু : ইরানে জনবিক্ষোভ উসকে দিয়ে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় মোসাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর হামলা শুরুর কয়েক দিন আগে মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় তিনি দাবি করেছিলেন, মোসাদ ইরানি বিরোধী পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশটিতে সরকার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্নিয়া জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ওয়াশিংটন সফরকালে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছেও এই প্রস্তাব পেশ করেন। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল, প্রথমে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং এরপর ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে দেশটিতে গণঅভ্যুত্থান ঘটানো।

নেতানিয়াহু মোসাদের এই প্রতিশ্রুতিকে পুঁজি করেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে, ইরানি সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের দেওয়া আট মিনিটের এক ভিডিও বার্তাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। যেখানে তিনি ইরানি জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে... আমরা কাজ শেষ করলে আপনারা সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। তবে যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহ পার না হতেই সরকার পতনের সেই স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটার সম্ভাবনা নেই। বরং সিআইএ সতর্ক করেছে যে, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হলে আরও কট্টরপন্থি কোনও নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে ব্যাপক বিদ্রোহ উসকে দিতে পারবে, এমন বিশ্বাসই ছিল এই যুদ্ধের প্রস্তুতির অন্যতম বড় ভুল। মার্কিন সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, মাথার ওপর যখন বোমা পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে না। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানে কোনও গণ-অভ্যুত্থান না হওয়ায় মোসাদের ওপর হতাশ হয়ে পড়েছেন নেতানিয়াহু। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর এক নিরাপত্তা বৈঠকে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মোসাদের অভিযান ফলপ্রসূ না হলে ট্রাম্প যেকোনও মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান এবং অনেক মার্কিন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মোসাদের এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন হল, ইরান সরকার কিছুটা দুর্বল হলেও এখনও যথেষ্ট সুসংহত অবস্থায় রয়েছে।

ইসরায়েলে হামলা আরও কঠোর করার হুমকি ইরানের : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রতিদিন দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান। এবার সেই হামলা আরও কঠোর করার হুমকি দিয়েছে দেশটি। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এ হুমকি দিয়েছে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ইসরায়েল যদি লেবানন ও ফিলিস্তিনের বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও কঠোর করা হবে। আমরা জায়নবাদী সরকারের অপরাধী সেনাবাহিনীকে এই মর্মে সতর্কবার্তা দিচ্ছি যে লেবানন ও ইসরায়েলের নিরীহ বেসমারিকদের ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যদি তারা আমাদের সতর্কবার্তায় কর্ণপাত না করে, তাহলে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে আমরা আরও কঠোর হামলা শুরু করব।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসছে পাকিস্তান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় এগিয়ে এসেছে পাকিস্তান। এনবিসি নিউজকে চারটি সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগে সহায়তা করছে ইসলামাবাদ। এসব সূত্রের মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শিগগিরই সরাসরি বৈঠকও হতে পারে। এক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে পাকিস্তান এবং যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য দেশটি ‘ভালো অবস্থানে’ রয়েছে। উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা জানান, গত দুই দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে পাকিস্তান।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা পাঁচ দিনের একটি সময় দিচ্ছি। দেখব কী হয়, যদি ভালো অগ্রগতি হয়, তাহলে আমরা এই সংঘাতের সমাধানে পৌঁছাতে পারব। না হলে হামলা অব্যাহত থাকবে।

হোয়াইট হাউজও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, এগুলো সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা। গণমাধ্যমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আলোচনা করে না। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বৈঠক নিয়ে কোনো জল্পনাকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরা উচিত নয়।

সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপ ও কূটনীতিতে ফেরার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার কথা ইরানি প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত