
বিগত সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যাচাই-বাছাই কমিটি। ১২০টিরও বেশি অধ্যাদেশের বিষয়ে এরই মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ২ এপ্রিল এই দীর্ঘ পর্যালোচনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে বিতর্কিত জুলাই সনদ বা সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। গতকাল বুধবার বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং তিনি এসব তথ্য জানান।
আইনমন্ত্রী জানান, দীর্ঘ পর্যালোচনার পর অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আমরা প্রায় ১২০টির বেশি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষ করেছি। কোনগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাখা হবে আর কোনগুলো বাতিল হবে, সে বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। তবে সুনির্দিষ্ট তালিকাটি এখনও চূড়ান্তভাবে ‘সর্ট-আউট’ করা হচ্ছে। ২ এপ্রিল রিপোর্টের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। বাকি থাকা কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় আলোচনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই বৈঠকের পরই পর্যালোচনার সব কাজ শেষ হবে এবং এগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পেজের ৬-এর ক ধারা অনুযায়ী, সনদের ৮৪টি আর্টিকেলের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। যারা একে বাইপাস করে ভিন্ন কোনো আদেশ দিতে চায়, তারা সনদের পরিপস্থি কাজ করছে। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি। নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দিকে তীক্ষè নজর রাখছি। ২ তারিখ রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর আইন পাসের প্রচলিত নিয়মেই বিলগুলো সংসদে উত্থাপিত হবে। তবে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় বা নির্দিষ্ট কোনো স্পর্শকাতর অধ্যাদেশ এই তালিকায় আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনই বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। মানবাধিকার কমিশন আইনের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে : অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন। তিনি জানান, এরইমধ্যে সব সংসদ সদস্যের কাছে অধ্যাদেশের কপি পাঠানো হয়েছে। যাচাই করতে তেমন সময় লাগবে না। তাই দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব বলে সরকার আশাবাদী। গতকাল বুধবার দুপুরে দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শুরুর আগে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। গত মঙ্গলবার প্রথম দিনের বৈঠকে প্রায় অর্ধেকের মতো অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করা হয়। সংসদে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এরপরই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়।
কমিটির সদস্যরা হলেন- ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস, কক্সবাজার-১ আসনের সালাহউদ্দিন আহমদ, বরগুনা-২ আসনের মো. নুরুল ইসলাম মনি, ঝিনাইদহ-১ আসনের মো. আসাদুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, নোয়াখালী-১ আসনের এ এম মাহবুব উদ্দিন, জয়পুরহাট-২ আসনের মো. আব্দুল বারী, পঞ্চগড়-১ আসনের মুহাম্মদ নওশাদ জমির, নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমীন পুতুল, রাজশাহী-১ আসনের মুজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের রফিকুল ইসলাম খান এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের জি এম নজরুল ইসলাম।
সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাস না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না। এ কারণেই এগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ। ওই দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, শোক প্রস্তাব এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপনসহ একাধিক কার্যসূচি ছিল। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদের অধিবেশন পুনরায় বসবে আগামী ২৯ মার্চ। চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।