
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে পড়ে বাসডুবির ঘটনায় মোট ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি একজনের লাশ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। যে ২৬ জনের লাশ পাওয়া গেছে তারা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার রেহেনা আক্তার ও তার ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মজমপুর গ্রামের মর্জিনা খাতুন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের রাজীব বিশ্বাস, রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের জহুরা অন্তি, একই মহল্লার কাজী সাইফ, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের মর্জিনা আক্তার ও তার মেয়ে সাফিয়া আক্তার, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের শিশু সন্তান ইস্রাফিল, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের সন্তান ফাইজ শাহানূর, রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা মহল্লার কেবিএম মুসাব্বিরের শিশু সন্তান তাজবিদ, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলা গ্রামের গাড়িচালক আরমান খান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দপুর ইউনিয়নের বেলগাছি গ্রামের নাজমিরা ওরফে জেসমিন, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের লিমা আক্তার, একই ইউনিয়নের চর বেনিনগর গ্রামের জোৎস্না, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার আমতলী ইউনিয়নের নোয়াধা গ্রামের মুক্তা খানম, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামের নাছিমা, ঢাকার আশুলিয়া উপজেলার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের আয়েশা আক্তার, রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার শিশু সন্তান সোহা আক্তার, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সমসপুর ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিনের শিশুসন্তান আয়েশা সিদ্দিকা, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের শিশু সন্তান আরমান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের শিশু সন্তান আব্দুর রহমান ও রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশি ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের শিশুসন্তান সাবিত হাসান, উজ্জ্বল নামের এক ফল ব্যবসায়ী, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন এবং একই উপজেলার চর মদাপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম।
গত বুধবার বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বাসটিতে প্রায় ৪৫ জনের মতো যাত্রী ছিলেন বলে বাসযাত্রী ও কাউন্টার মাস্টার জানিয়েছেন।
এদিকে বাস দুর্ঘটনায় গত বুধবার মধ্যরাতে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক, রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক এবং গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেছেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সদস্যের আরেক কমিটিও তিন কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রথমে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ক্রেন দিয়ে যখন বাসটি তোলা হয় তখন সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সবশেষ ২৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়। একজনের লাশ ফ্রিজিং করে রাখা হয়েছে। তার বাড়ি দিনাজপুরে। তিনি বলেন, রাজবাড়ী ছাড়াও গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও ঢাকা জেলার লাশ পাওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার চার গ্রামে শোক-মাতম : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে বাস ডুবির ঘটনায় কুষ্টিয়ার চারজনের লাশের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে; একজনের শেষকৃত্য হয়েছে। কুষ্টিয়ার নিহতরা হলেন- কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খোকসা উপজেলার খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), একই উপজেলার ধুশু-ু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩) এবং একই উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)। চারটি লাশ বুধবার রাতেই বাড়িতে আনা হয়। সেখানে তখন স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের তৈরি হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে স্বজন ও গ্রামবাসী তাদের জানাজার জন্য জড়ো হন।
বাসের ভেতর থেকে খায়রুলের বেঁচে ফেরার রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে বাসের ভেতর থেকে ‘অলৌকিকভাবে’ বেঁচে ফিরেছেন। তারা এখনও হতবিহ্বল। সেই বাসের অনেক যাত্রী বেঁচে ফিরেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। সেই সময়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ছেন। বেঁচে ফেরাদের একজন খোকসা উপজেলার আমবাড়িয়া গ্রামের কুদ্দুস খাঁর ছেলে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক খাইরুল খাঁ। তিনি বলছিলেন, সৌহার্দ্য পরিবহনের বি-২ আসনের যাত্রী ছিলেন তিনি, বিকাল পৌনে ৩টার দিকে উঠেছিলেন খোকসা কাউন্টার থেকে। তার পাশের বি-১ আসনে বসা ছিলেন সাদা রংয়ের টি-শার্ট পরা এক যুবক। তিনিও খোকসা বাসস্ট্যান্ড কাউন্টার থেকে চড়েছিলেন।
পোশাক শ্রমিক বলেন, ‘বাসটি ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর ওই যুবক নেমেছিলেন। আবার কয়েক মিনিট পর তিনি বাসে ফিরে আসেন। তাকে আসনে বসতে দেওয়ার সময় আমি দাঁড়াই। তখন বাসটি পন্টুনের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাসটিতে একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি বাসটি বেসামাল। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কোথায় কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু বোঝলাম, ঝাঁকুনির মধ্যেই প্রচণ্ড ধাক্কা লেগে দরজার কাছাকাছি চলে গেছি। দরজাটা খোলা ছিল। মনে হয়, ছিটকে নদীর পানিতে পড়ে গেছি। পাঁচ সেকেন্ডও লাগে নাই।’
খায়রুল বলেন, ‘আমি ছাড়া আশপাশে আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী এবং কিছু ব্যাগ পানিতে ভাসতে দেখি। তখন বোঝলাম বাস নদীতে পড়ে গেছে। ভাসতে থাকা যাত্রীরা সাঁতরে ফেরি ও পন্টুনে দাঁড়ানো লোকজনের সাহায্যে পানি থেকে উঠে জীবন বাঁচায়। আমাকেও একজন টেনে তুলেন। তবে আমার পাশের আসনে বসা ওই টি-শার্ট পড়া যুবকের আর কোনো দেখা পাইনি। আমার যতটুকু মনে পড়ে, এই বাসের প্রতিটি আসনেই যাত্রী ছিল। তাদের অধিকাংশই নারী এবং তাদের সঙ্গে শিশু ছিল। পুরো বাসভর্তি লোক ছিল।’
বাসের চালক, সহকারী ও সুপারভাইজারের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাসের সামনের দিকে আসনে থাকা খায়রুল বলেন, ‘বাসটি আসল চালকই চালাচ্ছিলেন। সুপারভাইজার সিরিয়ালের জন্য নেমে ঘাটে গিয়েছিলেন। আর হেলপার পন্টুনে বাসের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। যে কারণে, সুপারভাইজার ও হেলপার বেঁচে গেছেন। আর চালক আরমানের নাকি লাশ উদ্ধার করা হইছে।’
সৌহার্দ্য পরিবহনের খোকসা কাউন্টার মাস্টার রাকিব বলেন, ‘বাসটির বি-১ ও বি-২ নম্বর আসনের যাত্রী খোকসা স্ট্যান্ডের কাউন্টার থেকে ওঠেছিলেন। তাদের মধ্যে খাইরুল নামে এক যাত্রী বেঁচে ফিরেছেন। পাশে অজ্ঞাত পরিচয় এক যাত্রী উঠেছিলেন, তার কোনো সংবাদ এখনও পাইনি।’ রাকিব বলেন, ‘অনেকে বলছেন, বাসটি তখন প্রকৃত চালক চালাচ্ছিল না।
এটা একটা বানোয়াট, মিথ্যা কথা। চালক আরমানই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। বেঁচে ফেরা খাইরুলের সঙ্গে কথা বলে আমি সেটা জানতে পেরেছি। চালক আরমানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, বাসটির মালিক রাজবাড়ীর হওয়ায় চালক, তার সহকারী ও সুপারভাইজার সবাই সেখানকার স্থানীয়।