
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।’ গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টায় যশোরে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার কাজ করছে। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেনি। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ গণপরিবহন ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পায়। চতুর্দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করেনি।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেল নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০টা দেশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করলেও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি দাম বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেনি। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছে। কিন্তু আমাদের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন। পেট্রোল-অকটেনের চাহিদা ছিল ১২০০ থেকে ১৪০০ মেট্রিক টন। ঈদের আগে গড়ে প্রতিদিন ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমরা সরবরাহ করেছি।’ প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা কর্মসূচি চালু করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পরে বিভিন্ন সরকার উপকারভোগী ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছেন। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ শুরু করেছে। ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু হয়েছে। ধর্মগুরুদের সম্মানী চালু হয়েছে। পহেলা বৈশাখে কৃষক কার্ড চালু হবে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণকে প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের হক আদায় করলে সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে আসবে।’ অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ১৫৩ জন দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির হাতে এককালীন আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন প্রধান অতিথি।’ যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদ।
তেলের সরবরাহ সবসময়ই আছে, তবে কালোবাজারি হচ্ছে- জ্বালানিমন্ত্রী : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, আমি বারবারই বলেছি, তেলের আমাদের সমস্যা নাই, তবে সমস্যা হচ্ছে যে, পেট্রোল পাম্পে আগে দিনে এক লরি তেল লাগতো; এখন হঠাৎ যুদ্ধের কারণে মানুষ সব তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। যার কারণে ওই পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচতো এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। শুক্রবার সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় মন্ত্রী বলেন, তেলের সরবরাহ সবসময়ই আছে এবং সারা দেশের ডিসি-এসপিদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা মনিটরিং করছেন। তবে এই যে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে এবং সেটা কালোবাজারি (ব্লাক মার্কেটিং) হচ্ছে, যা এরমধ্যেই সিরাজগঞ্জসহ সারা দেশে ধরা পড়ছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কবে, জানাল পাম্প মালিক সমিতি : পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে শনিবার থেকেই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। শুক্রবার এক জরুরি বিবৃতিতে এ আশার কথা শোনায় অ্যাসোসিয়েশন। সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে তেল সংগ্রহের অনুরোধ জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। বিবৃতিতে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, বর্তমানে পেট্রোলপাম্পগুলোতে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা অনভিপ্রেত। আমার ৫০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি। এ অবস্থা সামলাতে সাধারণ গ্রাহকদের অবশ্যই সংযত হতে হবে।
জ্বালানি সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে বিবৃতিতে জানানো হয়, মার্চ মাসে অধিক মাত্রায় সরকারি ছুটি থাকায় জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক সরবরাহ প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে দেশের বেশ কিছু জায়গায় পাম্প সাময়িকভাবে তেলশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয় যে, আজ শনিবার থেকেই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুনরায় পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে ১ লাখ ৯৩ হাজার টন গ্যাস : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবস্থার মধ্যে পাঁচ দিনের ব্যবধানে প্রায় দুই লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে তিনটি জাহাজ। এর মধ্যে একটি এরইমধ্যে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় পৌঁছেছে, আর বাকি দুটি আগামী বুধবারের মধ্যে আসার কথা রয়েছে। তিনটি জাহাজ মিলিয়ে মোট এলএনজি আসছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এলএনজি বহনকারী ‘এইচএল পাফিন’ ট্যাংকারটি বৃহস্পতিবার কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘নিউ ব্রেভ’ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন এলএনজি বহনকারী ‘সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস’ নামের আরও দুটি জাহাজ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বুধবারের মধ্যে বন্দরে ভিড়বে। জাহাজ দুটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম জানিয়েছেন, বর্তমান সূচি অনুযায়ী ট্যাংকার দুটি সময়মতো পৌঁছাবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
পাইপলাইনে ভারত থেকে এলো ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল : ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পৌঁছেছে দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের রেলহেড ডিপোতে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাইপলাইনে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার ডিপোর সহকারী ইনচার্জ মো. জীবন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনে সরাসরি দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের রেলহেড ডিপোতে ডিজেল পৌঁছাতে সময় লেগেছে ৬০ ঘণ্টা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাইপলাইনে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। ডিজেল পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে শুক্রবার সকাল ৮টার সময় ডিপো করা হয়েছে।
কৃষিনির্ভর উত্তরের ৮ জেলায় চাষাবাদ সেচে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি ডিজেলনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ নিতে ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবর ১৫ বছর মেয়াদি ভারতের সঙ্গে চুক্তি হয়। চলতি বছর পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসবে পাইপলাইনের মাধ্যমে। চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ। সেই অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসি।
এর আগে গত ১১ মার্চ এসেছে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। শুক্রবার এসেছে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন এবং আগামী সপ্তাহে আরও পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনে আসার কথা রয়েছে। এছাড়াও আগামী ৪ মাসের মধ্যে ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি।