ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ট্রাম্পের আল্টিমেটাম, ইরানের প্রত্যাখ্যান

হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘নিষিদ্ধ’

* হরমুজ প্রণালীতে আটকা ৩ হাজার জাহাজ, চলাচল কমেছে ৯৪ শতাংশ * ‘আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী’ পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের * ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান : এক্সিওস * ট্রাম্পের ‘মানসিক ভারসাম্য’ নিয়ে প্রশ্ন মার্কিন রাজনীতিতে * ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২ * ইসরায়েলি বাহিনী এবং বসতির ওপর আরও হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ * ইরানের বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দাপ্রধান নিহত
হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘নিষিদ্ধ’

হরমুজ প্রণাল আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য তা চিরতরে বদলে গেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরের জন্য ইরানের কর্মকর্তারা যাকে ‘নতুন ব্যবস্থা’ বলে জানিয়েছেন, তা কার্যকর করার লক্ষ্যে তাঁরা এখন সামরিক প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটিতে একটি খসড়া আইন অনুমোদনের কয়েক দিন পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ওই আইনে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা যাতায়াত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবনায় যা যা রয়েছে— যাতায়াত শুল্ক ইরানের জাতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। যেসব দেশ ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, তাদের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ। তা ছাড়া ওই পরিকল্পনায় প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব, সশস্ত্র বাহিনীর কর্তৃত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত বিষয় এবং ওমানের সঙ্গে আইনি সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে বেশ কয়েকবার আলটিমেটাম বা সময় বেঁধে দিয়েছেন ট্রাম্প। অন্যথায় তিনি দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। ইরান ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটি ‘সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সময় রোববার তিনি এ হুমকি দেন। রোববার এবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের প্রতি সুনির্দিষ্ট এক নতুন সময়সীমা বেঁধে দেন। পোস্টে তিনি লেখেন ‘মঙ্গলবার, পূর্ব উপকূলীয় সময় রাত ৮টা!’ (তেহরানের সময় বুধবার মধ্যরাত)। একই দিন এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প বলেন, আমার দেওয়া আলটিমেটামের মধ্যে ইরান ‘কিছু না করলে’ তাদের কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতু অক্ষত থাকবে না। ট্রাম্পের এ আলটিমেটাম নিয়ে রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে আটকা ৩ হাজার জাহাজ, চলাচল কমেছে ৯৪ শতাংশ : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমেছে। তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের এই জলপথটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে লয়েড’স লিস্টসহ প্রধান বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩৮টি জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু গত কয়েক দিনে তা ১০টির নিচে নেমে এসেছে। আল জাজিরার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় হরমুজ প্রণালির আশপাশে আটকা পড়ে আছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে প্রায় ৩ হাজার ২০০ জাহাজ আটকা পড়ায় প্রায় ২০ হাজার নাবিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, মার্চের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৮১টি জাহাজ বা ট্যাংকার হরমুজ পার হতে পেরেছে, যার মধ্যে ১২৫টি ইরান বা তার মিত্রদের মালিকানাধীন। ইরান তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাককে এই বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত রেখেছে। তা ছাড়া চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক ইরানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তাদের জাহাজ পার করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, গত ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে অন্তত ২৪টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। এতে ৮ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিন পর ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তারা জানায়, হামলাকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না।

এবার পুরো ইরান উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন ট্রাম্প : ইরান ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটি ‘সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সময় রোববার তিনি এ হুমকি দেন। ট্রাম্পকে এবিসি নিউজের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রতিবেদক র‍্যাচেল স্কট প্রশ্ন করেন, চুক্তি করার জন্য ইরানকে দুই থেকে তিন সপ্তাহের যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা কি এখনো বজায় আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ওই হুমকি দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘এটি কয়েক সপ্তাহ নয়, কয়েক দিন হওয়া উচিত।’ তিনি দাবি করেন, ইরান ‘তছনছ হয়ে গেছে, একেবারে তছনছ। প্রতিদিন তা আরও খারাপের দিকে যাবে।’ ট্রাম্প বলেন, ‘প্রতিদিন তাদের (ইরানের) আরও বেশি সেতু নির্মাণ করতে হবে, আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে হবে এবং সবকিছু নতুন নতুন তৈরি করতে হবে। এর আগে কোনো দেশ এভাবে মার খায়নি।’ ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা এবং এর পরিণাম নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এ হুমকি দেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিন পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তারা জানায়, হামলাকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না।

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ‘আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী’ পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের : ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে ‘আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে আজ সোমবার সতর্ক করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের আক্রমণাত্মক ও প্রতিশোধমূলক অভিযানের পরবর্তী ধাপগুলো হবে আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী ও বিস্তৃত।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে একটি চুক্তিতে আসতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি এই হুমকি দেন। এখন পাল্টা হুমকি দিল ইরান।

৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান : গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধরত ইরান ও ইসরায়েল শিগগিরই ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পরে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সূত্রের বরাত দিয়ে সোমবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মাার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ তুলতে মার্চের শেষ দিকে ইরানকে ১০ দিনের ডেডলাইন দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ডেডলাইন শেষ হচ্ছে আজ সোমবার। এদিকে রোববার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় তিনি বলেছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিতে না আসে, তাহলে দেশটির সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের সূত্রগুলো এক্সিওসকে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এসব আল্টিমেটামণ্ডডেডলাইন ইরান মেনে নেবে— এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ, বরং এই ৪৫ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতিই এই যুদ্ধের উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে হ্রাস করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৪৫ দিনের এই সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি হবে দুই স্তরের। ইরান যদি ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে প্রথম স্তরে ৪৫ দিন পরস্পরকে লক্ষ্য করে হামলা করা থেকে বিরত থাকবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং প্রথম স্তরেই স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে আলাপ-আলোচনা শুরু হবে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে। আশা করা হচ্ছে, এই ৪৫ দিনের আলোচনা ৩ দেশকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে নিয়ে যাবে।

ট্রাম্পের ‘মানসিক ভারসাম্য’ নিয়ে প্রশ্ন মার্কিন রাজনীতিতে : ইরানকে উদ্দেশ করে কড়া ও আক্রমণাত্মক ভাষায় হুমকি দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে একাধিক মার্কিন রাজনীতিক এখন তার মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকিও দেন।

এই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘উন্মাদের প্রলাপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করছে।

স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পের আচরণকে ‘বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কংগ্রেসকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া সিনেটর ক্রিস মারফি ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে ‘চরম উন্মাদনা’ বলে উল্লেখ করে মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের প্রসঙ্গ তোলেন। এই সংশোধনী প্রয়োগ করা হলে প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী মার্জোরি টেলর গ্রিনও তার কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প ‘মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন’ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত তারা প্রণালি পুনরায় চালু করবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আলটিমেটাম এবং ইরানের শর্তের কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় গুরুতরভাবে পড়তে পারে।

ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২ : ইসরায়েলের হাইফা শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ উদ্ধার করেছেন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মীরা। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস জানিয়েছে, এই দুই ব্যক্তি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিলেন। পরে সেখান থেকে তাদের নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা বা নিখোঁজ থাকা আরও দুজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে খবরে জানানো হয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, রোববার ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হাইফার একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এতে ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। ছয়তলা ভবনটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

আল- জাজিরার খবরে বলা হয়, ঘটনাস্থলে গতকাল রাতের পর আজ সোমবার সকালেও তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছিল। এ ছাড়া হাইফায় নতুন করে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধারকর্মীরা সেখানেও কাজ করছেন।

ইসরায়েলি বাহিনী এবং বসতির ওপর আরও হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ : ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং বসতির ওপর আরও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা উত্তর ইসরায়েলের হুরফেইশ, শ্লোমি এবং নাহারিয়া বসতি লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীটি আরও জানিয়েছে, তারা সীমান্তে ফাতিমা গেটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যানবাহন ও সৈন্যদের একটি সমাবেশ লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস-এর গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল সাইয়েদ মজিদ খাদেমি নিহত হয়েছেন। ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতি অনুসারে, সোমবার ভোরে মার্কিন-জায়নবাদী শত্রুদের সন্ত্রাসী হামলায় খাদেমি নিহত হন।

তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় সোমবার সকাল থেকে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় শিশুসহ অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি গ্যাস স্টেশনও ছিল। হামলার পর পাওয়া ছবিতে তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য মঙ্গলবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিলে, অন্যথায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দেওয়া হবে বলে জানান। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। রোববার ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলেছেন, মঙ্গলবার ইরানে সবকিছু গুড়িয়ে এক করে দেওয়া হবে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দাপ্রধান নিহত : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দাপ্রধান মাজিদ খাদেমি নিহত হয়েছেন। তাকে হত্যার দায় নিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের পাশাপাশি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে এই হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে আইডিএফ বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড ইরানের বিপ্লবী গার্ডের জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা। অবশ্য ইসরায়েলের আগেই ইরানের পক্ষ থেকে খাদেমির নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, আজ সকালে তিনি নিহত হয়েছেন। তাকে হত্যার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে আইআরজিসি। ২০২৫ সালের ১৫ জুন ইসরায়েলি হামলায় আইআরজিসির তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান মোহাম্মদ কাজেমি নিহত হন। এর চার দিন পর তার স্থলাভিষিক্ত হন খাদেমি। এখন তাঁকেও হত্যা করল ইসরায়েল।

ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের শান্তি প্রস্তাবে কী আছে : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তান একটি কাঠামোগত শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। দুই ধাপের এই পরিকল্পনায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিসহ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানো। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো দ্রুত সংঘাত থামিয়ে পরে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো। প্রস্তাবটি নিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সারারাত যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় পাকিস্তানই প্রধান যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ : ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেবে না। তাদের মতে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। এর আগে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছে, যা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নিতে পারে।

চুক্তির সম্ভাব্য শর্ত : রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে থাকতে পারে— ইরান পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত থাকবে। এর বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। বিদেশে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হবে।প্রাথমিকভাবে এটি একটি সমঝোতা স্মারক আকারে তৈরি করা হবে এবং পরে তা চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেবে। ট্রাম্পের সময়সীমা ও চাপ : ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন খাতে নতুন হামলা চালানো হবে। তিনি নির্দিষ্ট করে সময়ও বেঁধে দেন—মঙ্গলবার রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম)। তবে তেহরান জানিয়েছে, তারা শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করলেও এর জন্য কোনো সময়সীমা মানবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তিতে যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি’র বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলবে না ইরান : সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তুত নয় বলেই মনে করে ইরান। তাই কেবল সাময়িক কোনো চুক্তির ভিত্তিতে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের অবরোধ তুলে নেবে না।

পাকিস্তানের দ্বি-স্তরীয় শান্তি পরিকল্পনা : সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে পাকিস্তান একটি দুই ধাপের শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত শত্রুতা বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই রুটটি সচল করা। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রয়েছে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর কার্যক্রম। পাকিস্তানের এই প্রস্তাব ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- উভয় পক্ষের কাছেই হস্তান্তর করা হয়েছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, এই চুক্তির প্রাথমিক বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা ছিল। পাকিস্তান বর্তমানে এই আলোচনার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

ইরানের অবস্থান ও শর্ত : ইরানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে তারা পাকিস্তানের প্রস্তাবটি পেয়েছেন এবং তা পর্যালোচনা করছেন। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা চাপের মুখে তারা সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্ভাব্য এই চুক্তির মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল— ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা হবে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী সমাধানের চেয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে বেশি আগ্রহী। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলেই মনে করছে তেহরান। ফলে, স্থায়ী কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত