ঢাকা বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাম ও উপসর্গে বাড়ছে শিশু মৃত্যু, সর্বোচ্চ শনাক্ত ঢাকায়

হাম ও উপসর্গে বাড়ছে শিশু মৃত্যু, সর্বোচ্চ শনাক্ত ঢাকায়

সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বিপজ্জনক হারে বেড়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। হামে অসুস্থতার পাশাপাশি শিশু মৃত্যু বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। গত রোববার থেকে গতকাল সোমবার ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২ শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ৫ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭২৯ শিশু আর হাম শনাক্ত হয়েছে ৮২ জনের। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমনার সকাল ৮টা পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে টিকা কার্যক্রমের গাফিলতির ভয়াবহ পরিণাম হামের এই প্রাদুর্ভাব। টিকা কেনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অহেতুক ও অপ্রত্যাশিত জটিলতা তৈরি হয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সেসময়ে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের দূরদর্শিতা ও সক্রিয়তার অভাবে শিশুদের টিকা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সঠিক সময়ে টিকা মজুত না করায় অসংখ্য শিশু যথাযথ বয়সে প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশু এবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার বড় অংশের বয়স ৯ মাসের কম। টিকার সূচি অনুযায়ী ৯ মাসের আগে কোনো শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয় না। শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’র মজুত পর্যাপ্ত থাকলে হাম তাদের সহজে কাবু করতে পারে না। তাদের অন্য কিছু রোগ প্রতিরোধের শক্তিও বেড়ে যায়। কিন্তু ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি থাকলে হামে আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্ধত্বেরও ঝুঁকি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই শিশুদের ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর সুপারিশ করেছে।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, দেশে একসময় হামের প্রাদুর্ভাব প্রায় নির্মূলের পথে ছিল। সেই হাম আবারও শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ টিকাদানের হার হ্রাস পাওয়া। একসময় যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় ছিল, সেখানে তা কমে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে, যা হামের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন, হাম মূলত তিনটি উপায়ে দ্রুত সংক্রমিত হয়। প্রথমত, আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস শ্বাসের সঙ্গে অন্যের শরীরে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশু নাক বা মুখ স্পর্শ করার পর অন্য কোথাও হাত দিলে সেই স্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তৃতীয়ত, আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত কাপড়, খেলনা, প্লেট বা গ্লাসের মতো জিনিস ব্যবহারের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র- সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হামের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রোববার থেকে সোমবার ২৪ ঘণ্টায় হামে যে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা ঢাকা বিভাগের। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া পাঁচ শিশুর চারজন ঢাকা বিভাগের, একজন রাজশাহীর। এই সময়ে সর্বোচ্চ ৭৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। চারজনের হাম শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী বিভাগে এবং চট্টগ্রাম শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই। বাকি বিভাগগুলোতে কোনো শনাক্ত রোগী নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চব্বিশ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ৩৭১ জনের মধ্যে। এর মধ্যে ৬১৫ জনই ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭২৯ জন, যার মধ্যে ২৭৪ জনই ঢাকা বিভাগে। সবচেয়ে কম রোগী ভর্তি হয়েছে রংপুর (১১) ও ময়মনসিংহে (১৭)। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৭১৩ জন গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩০৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ১২ এবং চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে ১০৩ জন করে রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত