ঢাকা শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হঠাৎ উত্তপ্ত ছাত্ররাজনীতি

হঠাৎ উত্তপ্ত ছাত্ররাজনীতি

রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের উত্তাপ্ত ছড়াচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষে ছাত্র রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারধরের ঘটনায় উভয়পক্ষের বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনার পর ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে আবারও হল-ক্যাম্পাস-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে রাখার রাজনীতি আলোচনায় আসছে।

‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি ও জামায়াতের মূল ছাত্র সংগঠনের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপ-প্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে। সংঘর্ষে অনেকের হাতে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দেখা গেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম দেয়ালে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ : গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। সেখানে ছাত্ররাজনীতি থেকে ছাত্র শব্দ মুছে দিয়ে তার উপরে গুপ্ত শব্দ লিখে দেওয়া হয়। এ নিয়েই সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। কলেজ ক্যাম্পাস ও নিউমার্কেট সংলগ্ন আইস ফ্যাক্টরি সড়কে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কলেজ রোড ও নালাপাড়া এলাকায় ‘শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস’ দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সিএমপির দক্ষিণ জোনের উপকমিশনার মাহমুদুল হাসান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইটের আঘাতে কয়েকজন আহত হন। সেসময় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে শিবিরের নেতাকর্মীরা সদরঘাট সড়কের দিকে সরে যান।

শাহবাগে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ : রাজধানীর শাহবাগ থানায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, হাতাহাতি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় ডাকসুর দুই নেতা, সাংবাদিকসহ আহত ১১ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শুক্রবার সকালে ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সবাই চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। আহতরা হলেন- ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের (২৩), সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক (২৩), তানজিম (২১), সিফাত (২০), লিটন (২১), খালিদ (২৫), আলভী (২২), দেবাশীষ (২৮), আফরোজা (৩০), জিসান (২৬) ও নবাব (২২)। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাত পৌনে ১০টার দিকে তারা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’ (এআই) দিয়ে তৈরি একটি আপত্তিকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রশিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের বিরুদ্ধে। তিনি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্যানেলের সদস্য পদপ্রার্থী ছিলেন বলে জানা গেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। জাইমা রহমানকে কটূক্তির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করতে যান তারা।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ছাত্রশিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ দাবি করেন, তার নামে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে তিনি ও তার সহযোগীরা থানায় যান। থানায় দুইপক্ষ মুখোমুখি হলে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার একপর্যায়ে থানার ভেতর ঢুকে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিকের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া ডাকসুর আরেক নেতা এ বি জুবায়ের থানার ভেতরে আটকা পড়েন বলেও অভিযোগ করা হয়। আহতদের হাসপাতালে দেখতে ঢাকা মেডিকেলে আসেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফেক স্কিনসর্ট নিয়ে আমাদের ডাকসুর নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। মামুন জীবনের নিরাপত্তার জন্য শাহবাগ থানায় যান জিডি করতে। যেখানে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা সেই থানাতেই আমাদের ভাইদের ওপর হামলা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিক ভাইদের ওপরও হামলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই হামলার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। আমরা প্রশাসনসহ ছাত্রদলের সবার সঙ্গে কথা বলব। আজ যারা আমার ভাইদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা করেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

কুমিল্লা পলিটেকনিকে ‘গুপ্ত’ বলায় ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ : কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ‘গুপ্ত’ বলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে কলেজ ক্যাম্পাসে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনে দেয়াললিখন নিয়ে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এ ঘটনায় রাতে ‘গুপ্ত’ বলাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে উভয় গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ছাত্রশিবিরের ২০ জন এবং ছাত্রদলের ১২ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এ সময় আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আহতরা হলেন- মেকানিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. জাফর ইকবাল, সাংবাদিক খালিদ, আবু রজিন, শুভ, মারুফ, তুহিন প্রমুখ। আহত আবু রজিন বলেন, অধ্যক্ষ স্যার ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উস্কে দিয়েছে। ওরা আমাকে অধ্যক্ষের রুম থেকে মারতে মারতে বাইরে নিয়ে আসে। আমার অন্য সহকর্মীদের ওপর হামলা করে। একজন স্যারের ওপর হামলা চালায়। তারা ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ছাত্রদলকে ইন্ধন দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। এখানে দুগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। আমার কক্ষে হামলা হয়েছে এবং আমরা এটা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। জাফর স্যারের ওপর হামলা হয়েছে কি না, আমি জানি না। আমরা পুলিশকে খবর দিয়েছি নিরাপত্তার জন্য। ছাত্রশিবিরের কুমিল্লা মহানগর সেক্রেটারি নাজমুল হাসান পঞ্চায়েত বলেন, ছাত্রদলের হামলায় ছাত্রশিবির এবং সাধারণ ছাত্র মিলিয়ে ১৫-২০ জন আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে আমরা হাসপাতালে তাদের দেখতে গিয়েছি। গুরুতর আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলরা সেখানে তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছেন।

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমন হোসেন বলেন, দেয়াললিখন নিয়ে দিনে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে। রাতে ভিন্ন একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা বহিরাগতদের নিয়ে আমাদের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এখানে তাদের কারা গুপ্ত বলেছে আমরা জানি না। হামলায় আমাদের ১২ জন ছাত্রদল কর্মী আহত হয়েছেন। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি কাজী জুবায়ের আলম জিলানী বলেন, গুপ্ত বলাকে কেন্দ্র করে পলিটেকনিক্যাল কলেজে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আহত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা সেখানের নেতাদের বলেছি। রাত ১০টায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের এএসপি মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, পলিটেকনিকে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার কারণগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আমি নিজেও ঘটনাস্থলে রয়েছি। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।

ঈশ্বরদী কলেজে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ : পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ঈশ্বরদী থানার ওসি আসাদুর রহমান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ক্যাম্পাস এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল কলেজ গেটের সামনে পৌঁছালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় ছাত্রদলের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি সজীব হাসান বলেন, আমাদের পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া ছিল। মিছিল নিয়ে কলেজ গেটের সামনে পৌঁছামাত্র ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর অতর্কিত ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। ছাত্রদলের কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।

অন্যদিকে, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ইমরান হোসেন খান পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ শতাধিক শিবিরকর্মী বহিরাগতদের নিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তারা কলেজ গেটের সামনে আমাদের একটি অস্থায়ী কার্যালয়ও ভাঙচুর করেছে। ঈশ্বরদী আমবাগান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আফজাল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঈশ্বরদী থানার ওসি আসাদুর রহমান বলেন, উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। কোনো পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করেনি, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যেই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না - অর্থমন্ত্রী : অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘স্থিতিশীল, সহনশীল ও সংবেদনশীল একটি দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা নির্বাচিত হয়েছি জনগণের ভোটে। যারা স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, তারা যেই হোক, তাদের আইনের চোখে ছাড় দেওয়া হবে না। যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দুই নেতার ওপর হামলাসহ উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মন্ত্রী এ কথাগুলো বলেন। এর আগে সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে নির্মিত ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজে সব সময় কিছু উচ্ছৃঙ্খল লোক থাকে, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাদের দল বলে কিছু নেই। সব সময় কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি সমাজে থাকে। তাদের বিষয়ে বাংলাদেশের আইন যথাযথ ব্যবস্থা করবে। আইনের বাইরে কেউ যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা পরিষ্কারভাবে বলছি, কোনো জায়গায় দলীয়করণ করার কোনো সুযোগ নেই। আমি একটু আগে বক্তৃতা করে বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের কেউ যেন ঢুকতে না পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করবে, এখানে দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই।’

মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দুধর্মাবলম্বী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘সনাতন ধর্ম পরিষদ’-এর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জমির ওপর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজ শুরু হয়। মনোরম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের মূল স্থাপনা নির্মাণে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছেন অদুল-অনিতা ফাউন্ডেশন। এটির নকশা ও প্রকৌশল সহায়তা দেয় ‘এস্ট্রো’ এবং ইন্টেরিয়র সজ্জায় যুক্ত ছিল ‘দি-অ্যাড কমিউনিকেশন’।

শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলকে লেলিয়ে দিয়েছে সরকার- গোলাম পরওয়ার : সরকার সংকট নিয়ে সংসদে সমঝোতার কথা বলে সারা দেশে শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলকে লেলিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ডাকসুতে ৩০ হাজার ছাত্রের ভোটে নির্বাচিত নেতাদের ওপর ছাত্রদল হায়েনার মতো আক্রমণ করে নির্যাতন করেছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনা, ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল শিবিরের ওপর নৃশংস হামলা করেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঝিনাইদহ শহরের জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্কের একটি অডিটোরিয়ামে জামায়াতের ওয়ার্ড সভাপতি সম্মেলনে এ কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ফটোকার্ড দিয়ে, অপপ্রচার চালিয়ে ও গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আপনারা শিবিরকে গুপ্ত বলেন? শিবির গুপ্ত নয়। দেশের জনগণ যদি বলে যারা ১৭ বছর পর বাইরে থেকে দেশে ফিরেছেন, তারাই গুপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থেকে যিনি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনিই গুপ্ত। যারা ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে পারেনি, তারাই গুপ্ত।’ গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, ‘শিবিরকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, আপনারা গুপ্ত কিংবা রগকাটা বলে অপ-প্রচার চালালেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেও সেটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক সংকট ও আবার রক্ত ঝরার দিন থেকে দেশকে বাঁচাতে চাইলে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ তা না হবে, ততক্ষণ আমাদের সংগ্রাম সংসদ ও রাজপথে চলবে।’

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে দাবি করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সাবেক এক প্রভাবশালী উপদেষ্টা নিজেই গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। তিনি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জুডিশিয়ারি তদন্ত দাবি করেন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দল একাত্ম হয়ে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার। ২৫ এপ্রিল দেশের সব মহানগর ও ২ মে সব জেলা শহরে ১১- দলীয় জোটের ব্যানারে গণমিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে- নাহিদ ইসলাম : দেশে পুনরায় বৈষম্য ও দলীয়করণের প্রবণতা বাড়ছে অভিযোগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফ্যাসিবাদ বা কোনো স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হলে জনগণ আবারও সংগঠিত হবে, এনসিপির ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হবে। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নাগরিকদের দলে যোগদান অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক সংগ্রামের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দল এনসিপি। তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে পরিবর্তন ও সংস্কারের যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেই লক্ষ্যেই এনসিপি দেশকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিল।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আমরা জনগণকে কমিটমেন্ট করেছিলাম- এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, এটি দেশ পরিবর্তন ও রাষ্ট্র সংস্কারের নির্বাচন। কারণ, এই নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পর সেই গণভোটকে অস্বীকার করা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লেগেসি থেকে এই নির্বাচনকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সাধারণ ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচনে পরিণত করেছে। সংবিধানসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো একে একে বাতিল করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সারা দেশ থেকেই দলটির প্রতি অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আমরা একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে চাই, যা তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, বৈষম্যদূর করবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে।

ক্যাম্পাসে সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান ঢাবি প্রশাসনের, দুটি তদন্ত কমিটি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে অশালীন পোস্ট করেছেন- এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এ ঘটনা তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া শাহবাগ থানায় শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। ‘অশালীন ফেসবুক পোস্টের’ ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়ক সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন। সদস্যসচিব হলটির আবাসিক শিক্ষক জাওয়াদ ইবনে ফরিদ। কমিটির অপর সদস্য তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. মোসাদ্দেক খান। কমিটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি এরইমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। শাহবাগ থানায় শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শান্টু বড়ুয়া। এ কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির জরুরি সভা হয়। সভায় হলের সৌন্দর্যসহ সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে হলের অভ্যন্তরে সব ধরনের দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি অঙ্কন থেকে বিরত থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ধৈর্যধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা প্রদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত