ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

‘সবার জন্য’ এই বাজেট

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী
‘সবার জন্য’ এই বাজেট

সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা বর্ণের সবাই বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আওতার ভেতরে আছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট প্রক্রিয়া বাংলাদেশে ৬ মাসের একটি কর্মযজ্ঞ। সে জায়গায় আমরা দেড়-দুই মাসের মধ্যে একটা বাজেট প্রস্তুত করেছি। এজন্য যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয়েছে, তারপরেও সবার সহযোগিতায় সে কাজটা আমরা করেছি। কতটুকু পেরেছি সেটা দেশের জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত নেবেন।’

তিনি বলেন, ‘এই বাজেটের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন ছিল। দীর্ঘ একটি ফ্যাসিস্ট রেজিম, তারপর অন্তর্বর্তী সরকার। এই সময়টাতে বাজেটের সত্যিকার কার্যক্রম, জনগণের চিন্তার প্রতিফলন, সেই বিষয়গুলো বিগত বহু বছর ধরে দেশবাসী মিস করেছে।’ ‘বাজেট বলতে মূলত জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলি। আমাদের সংবিধানও বলা হয়েছে জনগণের ইচ্ছায় জনগণের সম্মতিতে দেশ চালাতে। বহুদিন পর দীর্ঘ সংগ্রামের পর সবার অবদানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। একটি নির্বাচিত সরকার আমরা পেয়েছি এবং বিএনপি সরকার গঠন করেছে,’ বলেন অর্থমন্ত্রী।

‘এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক’ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য আমরা চেষ্টা করেছি সবার সঙ্গে কথা বলতে, সবার মতামত নিতে। যতটুকু সম্ভব আমরা পুরোপুরিভাবে চেষ্টা করেছি। এই বাজেটের প্রেক্ষাপটটা এজন্য একটু ভিন্ন যে, সত্যিকার অর্থে আমাদের বাজেট চিন্তায় ছিল বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে নিয়ে আসার। তাদের জীবনযাত্রার মান তাদের ভবিষ্যৎ সবসময় বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। এবারের বাজেটে আমরা চেষ্টা করেছি সবাইকে আনার। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণের কেউ এই বাজেটের আওতার বাইরে আছে বলে আমি মনে করি না,’ বলেন মন্ত্রী আমির খসরু।

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় দেশের সম্পদ লুণ্ঠন হয়েছে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে। রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে উচ্চণ্ডআকাঙ্ক্ষা এবং সবাইকে একটা ইনক্লুসিভ বাজেট করার চেষ্টা করেছি।’

‘প্রতিটি মানুষকে এই বাজেটের আওতায় আনার জন্য আমাদের স্লোগান ছিল এরকম যে, অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ করা। এই প্রেক্ষাপটটা আরও বেশি ধারণ করতে হয়েছে, কারণ আগে অর্থনীতিটা ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি, কিছু মানুষের জন্য অর্থনীতি, কিছু গোষ্ঠীর জন্য অর্থনীতি অথবা কিছু অর্গানাইজ গ্রুপের জন্য অর্থনীতি। যে মানুষগুলো অর্গানাইজ না, যারা পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি, যারা অর্থনীতির ভাবনার বাইরে ছিল, আমরা এই মানুষগুলোকে আনার চেষ্টা করেছি এবং সবার জন্য এই বাজেটে দিয়েছি,’ যোগ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই সীমিত সম্পদের মধ্যে সবার জন্য কম-বেশি বরাদ্দ দেওয়া আছে, প্রোগ্রাম দেওয়া আছে এবং রোডম্যাপ দেওয়া আছে। শুধু পলিসি বা নীতিমালা নয়, আমরা রোডম্যাপও দিয়েছি। এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের কী করতে হবে, সেটাও পরিষ্কারভাবে বলা বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন জ্বালানি খাতে বড় অভিঘাত এসেছে। তাছাড়া আগের যা আমরা ইনহেরিট করেছি, সেই প্রেক্ষাপটে বাজেট করতে গিয়ে সবার কথা মাথায় রেখে সবার জন্য বাংলাদেশ বা অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের মৌলিক নৈতিক ভিত্তি আমাদের বিবেচনায় ছিল।’

‘আমরা একটা কথা বারবার বলেছি, আমাদের প্রত্যেকটি ব্যয়ের পেছনে চারটা ক্রাইটেরিয়া আছে। একটা হচ্ছে ভ্যালু ফর মানি, একটা রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট, একটা জব ক্রিয়েশন, আরেকটা এনভায়রনমেন্টাল কনসিডারেশন। এই চারটি শর্তের ওপর ভিত্তি করে আমরা আগামী দিনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছি,’ যোগ করেন তিনি।

বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হচ্ছে : জ্বালানি মন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানি নির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) আরও সক্রিয় ও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যাপ্তভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতের এই বাস্তবতা পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ মন্ত্রী বলেন, বাপেক্সের জন্য আরও পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন কূপ খনন ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা যায়। এছাড়া সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানে বাপেক্সের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে অফশোর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ১ মাস পর দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ব্লকগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান কিছু জ্বালানি চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এরইমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে তেল আমদানি করেছে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে এবং তেলের সরবরাহে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তির কারণে সরকারকে একদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে কম দামে সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে সৃষ্ট ভর্তুকির বোঝা অর্থ মন্ত্রণালয়কে বহন করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধের দায়ভার নিতে হয়েছে। পাশাপাশি চলমান বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী এই সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে সরকার উৎসাহ দিচ্ছে। মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ‘স্পিনিং মার্জিন’ সংরক্ষণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এসব পদক্ষেপের ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত