
বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন জেলাসহ ভারতের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে সৃষ্ট জনমিতিক (ডেমোগ্রাফিক) পরিবর্তন খতিয়ে দেখতে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে সব ধরনের প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা দেন। ভারতের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মূলত বাংলাদেশ থেকে হওয়া কথিত অবৈধ অভিবাসন ও অনুপ্রবেশের বিষয়টি খতিয়ে দেখা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণার প্রায় এক বছর পর, গত ২৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয় এবং গত ২ জুন কমিটি তাদের প্রথম বৈঠক সম্পন্ন করে। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকারের নেতৃত্বে এই প্যানেলটি মূলত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা, বিভিন্ন মহানগর ও শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করবে। ভারতের সীমান্ত এলাকায় জনসংখ্যার ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং এর পেছনে অবৈধ অনুপ্রবেশের ভূমিকা কতটুকু, তা সরজমিনে খতিয়ে দেখাই এই প্যানেলের মূল কাজ। গতকাল শনিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) প্রধান তপন কুমার ডেকা এবং ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনার মৃত্যুঞ্জয় কুমার নারায়ণসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিটির কাজ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এর কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর আগে গত ২ জুন অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে ভারতের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমের পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও তারা খতিয়ে দেখবেন। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে, কমিটির এই পদক্ষেপের সঙ্গে তার সরাসরি সংযোগ রয়েছে। এরইমধ্যে এই প্যানেল সরকারের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করেছে। কমিটির কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী, তাদের মূল কাজ হলো অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক কারণে ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া জনমিতিক পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা এবং ‘জনসংখ্যা স্থিতিশীল’ করার জন্য উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সুপারিশ করা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কমিটি ভারতে বসবাসকারী কথিত অবৈধ অভিবাসীদের আইনানুগ, সুষ্ঠু ও সময়োপযোগী উপায়ে শনাক্তকরণ, আটক (ডিটেনশন) এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) জন্য একটি সুসংগঠিত ও স্থায়ী পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও কেন্দ্রীয় সরকারকে চূড়ান্ত সুপারিশমালা পেশ করবে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপর পুশব্যাকের মতো ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিচারপতি নাওলেকার ছাড়াও এই উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের সাবেক প্রধান সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা দুর্গা শঙ্কর মিশ্র, ব্যুরো অব পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা বালাজি শ্রীবাস্তব এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শমিকা রবি। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সচিব (বিদেশী-১) এই কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার একসঙ্গে ১২৫ জনকে সীমান্তে জড়ো করেছে বিএসএফ, প্রস্তুত বিজিবিও : ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত দিয়ে ১১ নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে। গতকাল রবিবার ভোর ৪টার দিকে সীমান্তের ৭৭ এস-২ পিলারের পাশ দিয়ে এ চেষ্টা চালানো হয়। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়। এদিকে দুপুরে আরও ১২৫ জনকে সীমান্ত এলাকায় জড়ো করা হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে বিজিবি। তাদের পুশইন করা চেষ্টা করা হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিএসএফ ১১ জন বাংলাভাষী নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবি সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে তারা ব্যর্থ হয় এবং ওই ব্যক্তিদের সরিয়ে নেয়। বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বিএসএফ ওই ১১ জনকে দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত থেকে বারাদী-সুলতানপুরের বিপরীতে নিয়ে গেছে। নিজস্ব সূত্রে জানতে পেরেছি দুপুরে আরও ১২৫ জনকে পুশইনের জন্য সীমান্তের বিপরীতে জড়ো করে রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিজিবির কঠোর অবস্থানে আছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্তে বিএসএফের এটিই প্রথম পুশইনের চেষ্টা। বিভিন্ন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টার ঘটনার পর ৬ বিজিবি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রৌমারী সীমান্তে ৯ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ বিএসএফের : কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও বড়াইবাড়ি সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে সেই চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হয়েছে। সীমান্তের শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে রয়েছেন কয়েকজন নারী, শিশু ও পুরুষ। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি। তবে গতকাল রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত সাড়া দেয়নি বিএসএফ।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার ভোরে আসামের ধুবড়ি জেলার জালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা বাধা দিলে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন। ওই ছয়জনকে কাঁটাতারের কাছাকাছি সীমান্তের ফাঁকা এলাকায় রেখে যায় বিএসএফ। একই সময়ে বড়াইবাড়ি বিওপি ক্যাম্পসংলগ্ন ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়েও আরও তিনজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। সেখানেও বিজিবি ও স্থানীয়দের সতর্ক অবস্থান এবং প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
গয়টাপাড়া সীমান্তের বাসিন্দা সফিয়ার রহমান (৫৫) বলেন, ‘বিএসএফ সদস্যদের নিয়ে আসা লোকজন এখনও জিরো লাইনে (শূন্যরেখা) অবস্থান করছেন। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। তারা কোন দেশের নাগরিক, সেটাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে একজন নারী ও দুজন শিশু রয়েছে। প্রচণ্ড রোদে তাদের কষ্ট দেখে খারাপ লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শূন্যরেখা থেকে কেউ যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য বিজিবির পাশাপাশি এলাকাবাসীও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পুশইন চেষ্টা প্রতিহত করতে আমরা বিজিবিকে সহযোগিতা করছি।’
বড়াইবাড়ি সীমান্তের বাসিন্দা খোরশেদ আলম (৩৫) বলেন, ‘বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে বিএসএফ সদস্যরা ওই তিনজনকে সরিয়ে ভারতের ভেতরে নিয়ে গেছেন। আমরা এখনও সতর্ক অবস্থানে আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে বিএসএফ সদস্যদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত সড়কে তাদের যানবাহন টহল দিচ্ছে। পরিস্থিতির দিকে সবাই নজর রাখছেন।’ জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘রোববার ভোরে দুটি সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ মোট নয়জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের বাধার কারণে তারা সফল হতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখনও তারা সাড়া দেয়নি। সীমান্তে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিষয়ে আমরা সতর্ক নজর রেখেছি।’ বিজিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সীমান্তে অবৈধ পুশ ইনের যেকোনো চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় জনগণও আমাদের সহযোগিতা করছেন। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত থেকে যুবককে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ : চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা সীমান্ত থেকে এক যুবককে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী-বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। গত শনিবার সন্ধ্যার আগে দর্শনা-গেদে আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান। ধরে নিয়ে যাওয়া জুলফিকার আলী উপজেলার জয়নগর গ্রামের কালো মৌলভীর ছেলে। তিনি দর্শনা পৌর এলাকার রামনগর বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। বিজিবি ও স্থানীয়রা জানান, বিকালে দিকে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় খড়ি কুড়াতে যান জুলফিকার। এ সময় গেদে বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাকে ধাওয়া করে আটক করেন। তার সঙ্গে থাকা আরও দুই থেকে তিনজন পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও জুলফিকারকে বিএসএফ সদস্যরা মারধর করতে করতে নিয়ে যান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।