ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রসিকিউশনে, ‘প্রয়োজনে আপিল’

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রসিকিউশনে, ‘প্রয়োজনে আপিল’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যা মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সাজা দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি এও বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সাজা বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে আপিল করা হবে। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আমিনুল।

রায়ের পর্যালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পেয়েছি ৮০৯ পৃষ্ঠার। সকাল থেকে যেটুকুন সম্ভব হয়েছে, আমি এটা পড়েছি। প্রাথমিকভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে অত্যন্ত জুডিসিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে ট্রাইব্যুনাল এই জাজমেন্টটা দিয়েছেন। ‘৩০ জন আসামি ছিল, ৩০ জনকেই তারা কনভিক্ট করেছেন, ৩০ জনকেই তারা সেন্টেন্স দিয়েছেন। আমাদের আইনে বলা আছে যে, মৃত্যুদণ্ড অথবা অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রোপোরশনেটলি তার শাস্তি হবে। তো আবু সাঈদ হত্যা মামলায় যারা সরাসরি গুলির অভিযোগ ছিল, তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং সেই গুলিতে যারা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে, তাদেরকে যাবজ্জীবন দিয়েছে।’ প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যারা ইট-পাটকেল মেরেছে, লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করেছিল বা যাদের এই টোটাল পার্টিসিপেশন যাদের ছিল, অভিযোগের প্রোপোরশনেট হারে তাদেরকেও শাস্তি দিয়েছে। কেউ কিন্তু শাস্তির বাইরে যায় নাই।’ রায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এই মুহূর্তে দ্বিমতের সুযোগ দেখছেন না বলেও জানান আমিনুল ইসলাম।

‘আমরা মনে করি যে এই জাজমেন্টটা সঠিক দিয়েছে এবং যেসব আলোচনা তারা করেছেন, আমরা সেই আলোচনার সঙ্গে এখন পর্যন্ত দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ দেখছি না। তার পরেও আমরা আরও দেখতেছি জাজমেন্ট, আরও একটু মেটিকুলাসলি পর্যালোচনা করি। দেখার পরে কোনো কারণে কারও বিরুদ্ধে যদি আমাদের সাজা বাড়ানোর জন্য অথবা অন্য কোনো কারণে আমাদের আপিল করার প্রয়োজন হয়, তাহলে সাজা বৃদ্ধির জন্য আমরা আবেদন করব, আপিল করব। আর যদি প্রয়োজন না হয়, আপিল করার প্রয়োজন না থাকলে আমরা আপিল করব না।’ গত ৯ এপ্রিল আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুজন হলেন-এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেন- তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। পৃথক ধারায় এ তিনজনের আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ৫ জনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৮ জনের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১১ জনের ৩ বছরের সাজা হয়। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়। দণ্ডিত ৩০ জনের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন, বাকি ২৪ জন পলাতক।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার উদ্যোগ নেওয়ার পর আবু সাঈদের মামলাটিও সেখানে আসে। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

ওই বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি এবং প্রত্যক্ষদর্শী বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই রায় দেওয়া হয়।

রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি-ট্রাইব্যুনালে রায় ২৮ জুন : চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ২৮ জুন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এ দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর রায়ের এই দিন নির্ধারণ করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এদিন শুনানিতে প্রথম আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। এ ঘটনার সঙ্গে তার মক্কেলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলার পাঁচ আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে যুক্তি খণ্ডন করেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। দুপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করে। এ মামলায় অভিযুক্ত মোট পাঁচ আসামির মধ্যে শুধু চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি চার আসামি পলাতক। তারা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে নতুন করে ‘ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স’ জমা দেওয়ার আবেদন করা হলে তা পিছিয়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া আমির হোসেনকে ট্রাইব্যুনালে পুনরায় সাক্ষ্য দিতে হয়। গত বছরের ৭ অগাস্ট প্রসিকিউশন এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত