
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প, সামরিক সহযোগিতা এবং চীনের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় থাকার কথাও বলেছেন তিনি।
গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরকার প্রধানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে এসব তথ্য দেন পররাষ্ট্র সচিব।
চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৭টা দলিল চীনের সঙ্গে স্বাক্ষর হবে বলে আশা করছেন তারা। এর মধ্যে ১৩টি এমওইউ, দুইটি চুক্তি, একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ এবং আরেকটি প্রটোকল।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ২১ থেকে ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। ২২ জুন চীনের দালিয়ানে গিয়ে পরের দুদিন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে গিয়ে বিভিন্ন আয়োজনে যোগ দেবেন তিনি। ২৪ থেকে ২৬ জুন বেইজিং সফর করবেন তারেক রহমান। ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী এবং শেষদিন চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তিনি।
যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনা বাঁধ নির্মাণের প্রসঙ্গে ধরে পদ্মা বহুমুখী প্রকল্প ও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনার বিষয়ে করা প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব সিয়াম বলেন, ‘সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা বা ‘ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ একটা আলোচনার বিষয় এবং আমি ধারণা করি সেই আলোচনা অনেক বিস্তৃত এবং সম্প্রসারিত। ‘সেখানে আপনারা যে প্রসঙ্গগুলো তুলেছেন, তার বিস্তারিত আলোচনা হবে বলেই আমি ধারণা করি। আমরা তুলব, তিস্তা প্রসঙ্গ তুলব। সেক্ষেত্রে অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনা বা ‘ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের’ ক্ষেত্র থেকে আরও আলোচনা বিস্তৃত হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। বাংলাদেশ সরকারের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় অর্থায়নের প্রস্তাব প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। একটা ‘স্টাডি’ হয়েছে, আমরা সেই বেশ কিছু আগে, সেই ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’টা আমরা ‘রিভিজিট’ করেছি। কিন্তু ‘রিভিজিট’ করার পর, আবার যেটা বললাম ‘রিজার্ভার, ড্যামেজ সাইজ’-এগুলো আসলে তারপর সমস্ত আলোচনা হবে। সুতরাং এই পর্যায়ে আমরা সেই ‘স্টেজে’ নাই। শি জিনপিংয়ের চার উদ্যোগে যোগদান চীনা প্রেডিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যে চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ, সেগুলোকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সেগুলোতে যোগদানের বিষয়টি ‘বিবেচনা’ করছে, বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব।
এই চার উদ্যোগের কোনোটিতে বাংলাদেশ এই সফরে যুক্ত হচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ আছে। সে চারটি উদ্যোগে যোগ হওয়ার বিষয়টা আমরা মোটামুটি ‘কনসিডার’ করছি। ‘আমরা সফরের পরে বলতে পারব যে, কয়টি উদ্যোগে আমরা যোগ দিচ্ছি বা যোগ দিচ্ছি না। তবে, আমরা এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমরা এসব, চারটি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্ব নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা করছেন, সেটাকে আমরা মনে করি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভে’ যোগ দিচ্ছি কি-না, পৃথক আরেক প্রশ্নে সচিব সিয়াম বলেন, ‘আমরা সবগুলো উদ্যোগকে বিবেচনা করছি এবং সাধুবাদ জানাচ্ছি। আমরা অংশগ্রহণ করছি কি করছি না, সেটা সফরের পর বলা যাবে। এটা এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সামরিক কেনাকাটার বিষয়ে সফরে আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সামরিক কেনাকাটার বিষয়ে আলোচনা কর্মকর্তা পর্যায়ে হয়ে থাকে। সামরিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ এবং দ্বিপক্ষীয় একটা সম্পর্ক রয়েছে। ক্রয়-বিক্রয় করব কিনা, ‘লিডারশিপ’ পর্যায়ে ওগুলো আসলে যে আলোচনা হয় (তা না), সেগুলো ‘অপারেটিভ লেভেলে’ হয়। নিশ্চয়ই আমরা দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা যেটা আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করব।’
বিভিন্ন প্রকল্পের কী অর্থায়নের প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চীনে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে অর্থায়নের পরিমাণ ও খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় না। সেগুলো মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের আলোচনায় হয়।
‘কী ধরনের আলোচনা হয়, আলোচনাটা হয় যে আপনারা এটা অর্থায়ন করতে রাজি আছেন? তারা হয়ত বলে আছি। তারপর এটা ‘অপারেটিভ লেভেল’ আলোচনা হয়। সুতরাং ‘স্পেসিফিক অ্যামাউন্ট’ জানতে চাওয়া- এটা আরও ‘ওয়ার্কিং লেভেলে’, সচিব পর্যায়ে, মন্ত্রী পর্যায়ে, ঠিক নেতাদের পর্যায়ে হয় না।’
আরও কর্মী নিতে মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আল সিয়াম।
গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
আসাদ আল সিয়াম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের আরও কর্মী নেওয়ার জন্য আমরা অনুরোধ করব। তবে আপনারা জানেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ সব দেশের বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনার মধ্যে রেখেছে। আমরা আশা করি, এই রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে। তবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর।
এরপর তিনি যাবেন চীনে। প্রধানমন্ত্রী সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে পাঁচ দিনের সফরে চীনে পৌঁছাবেন।
দুই দেশ মিলিয়ে ছয় দিন সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরসঙ্গী হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকবেন ২৭ জন এবং চীনে ২৮ জন। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, সফরসঙ্গী যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন প্রমুখ।
অন্যদিকে, সফরসঙ্গী হিসেবে চীন যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন প্রমুখ।