
কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল (আওয়ামী লীগ) তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত করে বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করার পরিকল্পনা করেছিল। এমনটি জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তাদের এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবাড়া আয়োজিত পবিত্র আশুরা উদযাপন ও তাজিয়া শোক মিছিল উপলক্ষ ডিএমপি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব বলেন তিনি। মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, আজকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার গোয়েন্দা রিপোর্ট আমাদের কাছে ছিল। সেই অনুযায়ী আমরা গত তিনদিন থেকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ঢাকার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট জোরদার করেছি, পিকেট, মোবাইল পেট্রোল, ফুট পেট্রোলের সংখ্যা বাড়িয়েছি। সাদা পোশাকে ডিউটি ও টহল বাড়িয়েছি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কর্মী বা সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় জড় হয়ে মিছিল বা জমায়েতের সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় রেখে আমরা প্রত্যেকটি সন্দেহজনক জায়গা, যেমন- মেস, হোটেল এবং বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি করেছি এবং আমরা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছি। তিনি বলেন, আমাদের মনে হয়েছে, তারা আজকে মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার মাধ্যমে সরকারকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে চায়। ডিএমপির সদস্যরা তাদের এই পরিকল্পনাকে এখন পর্যন্ত নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং আশা করি, আর যতটুকু আছে, এই সময়ের মধ্যেও তারা কোথাও মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হতে পারবে না।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে আমরা সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়েছি। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং আমরা সেই মিছিল থেকে ও মিছিল পরবর্তী সময় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। ককটেল বিস্ফোরণ থেকে একটি বিষয় আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে যে, যে কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা তাদের থাকতে পারে। আমাদের এটা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। তবে, যেহেতু তারা মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণ করেছে, তাতে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত যে সুযোগ পেলে তারা নাশকতা করতে পারে। তাই ঢাকার বাইরে থেকে যেন কেউ ঢাকা শহরে প্রবেশ করে এই ধরনের নাশকতা করতে বা কোনো ধরনের মিছিল বা সমাবেশ বা জমায়েত হতে না পারে এজন্য আমাদের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারাগার থেকে অনেক অপরাধী পালিয়ে গেছে। আশুরা ও তাজিয়া মিছিলে নাশকতার শঙ্কা রয়েছে কি না জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এই বছর এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো আলামত আমাদের কাছে নেই। তবে, আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। যে কোনো ধরনের নাশকতা, যে কোনো ধরনের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য আমাদের সব সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।
আশুরা ও তাজিয়া মিছিল উপলক্ষে ডিএমপির গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন শোক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে ব্যাপক ও নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে ডিএমপি। এ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ডিএমপি কমিশনার জানান, এবারের পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বিভাগ (লালবাগ, ওয়ারী, রমনা, তেজগাঁও, মতিঝিল ও মিরপুর) থেকে মোট ২৮টি ইমামবাড়া কর্তৃক ১ থেকে ৭ মহররম পর্যন্ত মোট ৬৩টি তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি তাজিয়া মিছিলের রুট নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি তাজিয়া মিছিল ও প্রধান প্রধান সমাবেশস্থলকে কেন্দ্র করে আমরা ব্যারিকেড, পিকেট, লাইনিং এবং রুফটপ বা ছাদণ্ডনজরদারি ডিউটি মোতায়েন রয়েছে। হোসেনি দালান, ইমামবাড়াসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ইমামবাড়া ও সমাবেশস্থলগুলোকে ড্রোন ক্যামেরা ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র্যাব এবং সিটিটিসির ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্বারা প্রতিটি ভেন্যু ও রুট সুইপিং বা তল্লাশি করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইমামবাড়া বা সমাবেশস্থলগুলোতে আর্চওয়ে গেট এবং মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল তল্লাশি এবং ম্যানুয়াল চেকিং নিশ্চিত করা হবে। হোসেনি দালান ইমামবাড়ায় একটি অস্থায়ী সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। হোসেনি দালান ইমামবাড়া, আঞ্জুমান হায়দারি, বড়কাটারা ইমামবাড়া, শিয়া মসজিদ, বিবিকা রওজা এবং মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানসমূহকে পুলিশের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
তাজিয়া মিছিলের বিশেষ রুট ও ট্রাফিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী ২৬ জুন সকাল ১০টায় হোসেনি দালান ইমামবাড়ার উত্তর গেট, হোসেনি দালান মোড়, বকশীবাজার লেন, আলিয়া মাদরাসা মোড়, বকশীবাজার (কলপাড়) মোড়, উমেশ দত্ত রোড, উর্দু রোড মোড়, হরনাথ ঘোষ রোড, লালবাগ চৌরাস্তা মোড়, গৌর-এ-শহীদ মাজার মোড়, এতিমখানা মোড়, আজিমপুর চৌরাস্তা মোড়, ইডেন মহিলা কলেজ, নীলক্ষেত মোড়, মিরপুর রোড, ঢাকা কলেজ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২নং রোড, বিজিবি ৪নং গেট, সাত মসজিদ রোড (জিগাতলা) হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্য ধানমন্ডি লেক (কারবালা)-এ গিয়ে মিলিত হবে। এই রুটগুলোতে সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে।
মিছিল চলাকালীন তীব্র যানজট এড়াতে নগরবাসীকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেন তিনি।
তাজিয়া মিছিলের দীর্ঘ পথ ও জমায়েতের কথা বিবেচনা করে আপদকালীন সময়ে ফায়ার ফাইটার বা ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হবে। এর পাশাপাশি, ধানমন্ডি লেক কারবালা সংলগ্ন জলাশয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দক্ষ ডুবুরি দল মোতায়েন থাকবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার।
আয়োজক কমিটির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, প্রতিটি আয়োজক কমিটিকে তাদের নিজস্ব পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (আইডি কার্ড বা নির্দিষ্ট পোশাকসহ) মিছিলে ও ইমামবাড়ায় মোতায়েন রাখতে হবে, যারা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। পাইক মিছিল সংক্রান্তে বিদ্যমান সব নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। কোনো ধরনের ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা, ব্যাগ, পোটলা বা সুটকেস নিয়ে মিছিলে অংশ নেওয়া যাবে না। এছাড়া, আগত ব্যক্তিদের ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা, কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট বা বক্সসহ প্রবেশে বাধা দিতে হবে। উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা পিএ সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো ধরনের ঢাক-ঢোল বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আতশবাজি বা যে কোনো ধরনের পটকা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। ২৬ জুন সকাল ১০টা থেকে তাজিয়া মিছিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত রুটগুলোতে ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে। তীব্র যানজট এড়াতে ও মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা মহানগরীর চালক ও সাধারণ জনগণকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করার জন্য যানবাহন চালকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
অনলাইন গুজব প্রতিরোধে বিশেষ বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা সাইবার পেট্রোলিং এবং সোস্যাল মিডিয়া মনিটরিং কার্যক্রম চলমান থাকবে। কোনো ইমামবাড়া বা মিছিলের রুটে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ব্যাগ পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তব্যরত পুলিশ কিংবা ডিএমপির ট্রাফিক কন্ট্রোলরুম- ০১৭১১০০০৯৯০, ০১৭১১০০০৯৯১, পুলিশ কন্ট্রোলরুম-০১৩২০০৩৭৮৪৫, ০১৩২০০৩৭৮৪৬ ও জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানান ডিএমপি কমিশনার।
আওয়ামী লীগের ২৬ জনসহ একদিনে ১১৮ গ্রেপ্তার - ডিএমপি : ঢাকা মহানগর পুলিশ তাদের বিশেষ অভিযানে ১১৮ জনের গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে বলছে এর মধ্যে ২৬ জন কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপির পক্ষ থেকে পাঠানো দুইটি পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, সোমবার দিনভর বিভিন্ন থানা এলাকায় এ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গতকাল মঙ্গলবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশের ছয় জায়গায় সোমবার নামনো হয় সেনাবাহিনী এবং বিজিবি। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীতে চলে বিশেষ অভিযান। এছাড়া ডিএমপি আগেই জানিয়েছিল, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ থাকবে। ঢাকার দুই শতাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানো হবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রমনা ও খিলক্ষেত থানা পুলিশ ২ জন করে, ধানমন্ডিতে ১০ জন, মোহাম্মদপুর থানা ৮ জন, এবং বংশাল, কদমতলী, মিরপুর ও তুরাগ থানা পুলিশ ১ জন করে গ্রেপ্তার করে।
পৃথক আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট বিশেষ অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা অপরাধে জড়িত অভিযোগে মোট ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এ অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন তালিকাভুক্ত ও একজন তালিকাবহির্ভূত চাঁদাবাজ রয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাতি সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত ৩৩ জন এবং মাদক কারবারে জড়িত ৩৭ রয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পৃথক অভিযানে আরও ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় ২ জন, চুরির মামলায় ২ জন এবং মাদক মামলায় ৬ জন রয়েছে। জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়েছে ডিএমপি।