
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি তিস্তা ব্যারেজ মাস্টারপ্ল্যানকে জাতীয় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যে কোনো মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।’ গতকাল সোমবার দুপুরে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যে সরকার এরই মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তা ব্যবহার করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃনদী সংযোগের অভাবে বাংলাদেশ ভুগছে। এর ফলে অনেক নদীর নাব্য হারিয়ে গেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এমন এলাকা পরিদর্শন করেছি, যেখানে বর্ষায় চারদিকে পানি থাকলেও অল্প দূরের কৃষকরা পানির অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারেন না। তবে এই সমস্যা সমাধানে দেশব্যাপী নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পানিপ্রবাহ, সেচব্যবস্থা এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা যাতে উন্নত করা যায় এ লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি চলছে। গত তিন মাসে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে।’
কৃষকদের জন্য সরকারের সহায়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ এবং তার সুদ মওকুফ করা। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার বিশেষ কৃষক কার্ড চালু করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষক এই কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা এবং অন্তত ১০টি অতিরিক্ত সেবা পাবেন। আমরা কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছি।
যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সেবার পরিধি বাড়াতে সরকার কাজ করছে।’ এর অংশ হিসেবে প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা সহজলভ্য করতে এবং বিদেশে তাদের ভোগান্তি কমাতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল পরিকল্পনা ও অবহেলার কারণে দেশের জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে অবহেলা করে বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার এখন জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে আমদানি নির্ভরতা কমানো যায়।’
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো এমন একটি শক্তিশালী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।’
শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে আগের শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট এ অধিবেশনে প্রথমে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন।
কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন খাতে কর কমানোর আহ্বান : প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ক-কর কমানোর পাশাপাশি ‘কালো টাকা সাদা করার’ বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সংশোধনীর প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে তুলে ধরেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সকালে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। প্রথমে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এর পর সংসদ নেতা তারেক রহমান বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নরমালি দাবিটা বিরোধীদল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই। করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখেন সংসদ নেতা।
স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে ‘প্রশ্ন ও উদ্বেগ’ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতে ওই বিধান আনা হয়েছিল।
তবে অনেকেই বিষয়টিকে ‘কালোটাকা সাদা করার’ সুযোগ হিসেবে দেখায় প্রস্তাবিত ওই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন সংসদ নেতা।
ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে জনমনে ‘বিভ্রান্তি’ সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। সে কারণে তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তবে শর্ত দিতে হবে যে, কর সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে হবে।
এ সময়ে সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের সদস্য টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অভিনন্দন জানায়। পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন তারেক রহমান।
তরুণ প্রজন্ম ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাজেটে প্রথমবারের মতো রাখা ৫০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ ফান্ডিংয়ের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে দেশে এক বিশাল কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন, যাতে ব্যবসায়ীরা হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত হন এবং সরকার রাজস্ব পায়।
দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও আমদানি শুল্ক হ্রাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। দেশের চিংড়ি চাষের প্রসার ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে একিউফিড, ফিড এডিটিভস, প্রোবায়োটিক্স, ভিটামিন ও মিনারেলস আমদানিতে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এছাড়া স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান, ওষুধ ও স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত মধু আমদানির ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পিভিসি ও পেট রেজিন আমদানির প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। ফায়ার ডোর উৎপাদনের কাঁচামাল কোল্ড রোল্ড শিট আমদানির ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং ফ্ল্যাট রোল্ড প্রোডাক্ট আমদানির ১০ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান অর্থমন্ত্রীকে।
বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের রিফাইন কপার আমদানির ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ক্যাশনাট প্রসেসিং শিল্পের কাঁচামাল অপ্রক্রিয়াজাত বাদাম আমদানির কাস্টমস শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথা বলেন।
স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প এবং প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার আহ্বান জানান তিনি। ব্যবসায়ীবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে স্বর্ণ, ডায়মন্ড ও রৌপ্য অলংকারের ভ্যাটের হার পুনর্নির্ধারণ, বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। রাজনীতি ও নির্বাচনি প্রচারণায় বহুল ব্যবহৃত ডাবল কেবিন পিকআপ এবং মাইক্রোবাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সম্পদে নয়, বরং জনগণের আস্থায় নিহিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও এর সার্বিক উন্নয়নে সুপ্রিম কোর্টকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়কে আরও ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
একই সঙ্গে দক্ষ, সৎ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতার একটি জনবান্ধব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশবান্ধব ও গরিবের বাহন হিসেবে পরিচিত সাইকেলের ওপর থেকে সব প্রকার শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সর্বোচ্চ বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনসহ দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখায় দেশের সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে তরুণদের চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না, তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদণ্ডএর সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বিরোধীদলের নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আমরা দেশের এই অর্থনৈতিক সংকটকে অস্বীকার করতে চাই না, তবে সংকটকে কোনো অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করব না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা হবে।
সরকারের যাত্রালগ্ন থেকেই রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সংকটের কারণে যে বিশাল চাপ তৈরি হয়েছিল, তা দেশের সাধারণ মানুষও বুঝতে পেরেছে। এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বহুমুখী সংকটকে সামনে রেখেই এই বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ তাদের যে পবিত্র দায়িত্ব দিয়েছে, তা রক্ষা করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং সরকারের মূল দর্শন হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা শিরোনামে উপস্থাপিত এবারের বাজেটটি শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনীতিকে একটি নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর রূপকল্প বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো- অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের কবল থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চাকা বেগবান করতে উন্নয়ন ব্যয় পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পেছনে কত টাকা ব্যয় হলো তা বড় বিষয় নয়, বরং সেই প্রকল্প মানুষের জীবনে কী ভূমিকা রাখবে এবং কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সেটিই সরকারের মূল বিবেচনা।
অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ করা হবে। আর চূড়ান্ত ধাপে উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবননির্ভর প্রতিযোগিতাপূর্ণ অর্থনীতির ভিত সুদৃঢ় করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেই প্রকৃত উন্নয়ন হয় না, প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয় যখন সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি আসে এবং তরুণরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায়। ঋণনির্ভর নয়, বরং উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে তরুণদের চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ, রুগ্ন শিল্প-কারখানা পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি রপ্তানিমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।