
সারা দেশে সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সব নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচন ইসির জন্য বড় পরীক্ষা বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ নির্বাচনের মধ্যেমে নিজেদের ইমেজ ধরে রাখার চেষ্ঠা করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ইসি কর্মকর্তারা জানায়, আগামী আগস্ট মাসে তফসিল দিয়ে হতে ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় রেখে আক্টোবরের শুরুতে ভোটগ্রহণ করতে চায় ইসি। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আগে অগ্রধিকার দিচ্ছে ইসি। কারণ দেশে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ নিবার্বাচন উপযোগী রয়েছে। এসব ইউপিতে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ করবে ইসি। এর পর সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনসহ পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনে তেমন সহিংসতা না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা হতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টতা। কারণ এবার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় ভোট হচ্ছে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী অংশগ্রহণ করবে, এ কারণে সহিংসতা শঙ্কাও বাড়বে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী অক্টোবর থেকেই দেশে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চলতি জুলাই বা আগস্টের মধ্যেই প্রথম ধাপের নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
তিনি বলেন, যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি নেই এবং যেগুলোর আইনি মেয়াদ এরইমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেগুলোকে প্রথম ধাপে নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে প্রয়োজনবোধে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একই সঙ্গে আয়োজন করা হতে পারে। তবে প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা আপাতত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না।
এছাড়া প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও আদালতের নির্দেশনা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত আইন সংশোধনের কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, বিদ্যমান আইনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্পষ্টতা দূর করতেই কিছু পর্যবেক্ষণসহ সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। সংশোধিত আইন কার্যকর হলে সে অনুযায়ী, নতুবা বিদ্যমান আইনেই সময়মতো ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
কমিশন এরইমধ্যে নির্বাচনি আচরণবিধির পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে এবং তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা এড়াতে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকদের ভোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিদ্যমান আইনি অস্পষ্টতাও কমিশন দূর করবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। ইসির কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসন এবং বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের তফসিল হবে। এরপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হবে। এক্ষেত্রে ইউপির পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম ছাড়া বাকি ১১টি সিটি কর্পোরেশনেই জনপ্রতিনিধি নেই। প্রশাসক দিয়ে চলছে এসব সিটি কর্পোরেশন। আর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে। এরপর অন্যান্য নির্বাচন হবে। এর আগে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে গত বুধবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে জানান। ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন কবে হতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব, আমরা এগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করব। যত দ্রুত সম্ভব, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ইউনিয়ন পরিষদ বাদে স্থানীয় সরকারের অন্য সব প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের এখনো অপসারণ করা হয়নি। তবে তাদের অনেকেই কারাবন্দি, আবার অনেকেই এলাকাছাড়া। এই অবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে প্রশাসক দিয়ে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে সরকার ও ইসি।
ইসি সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মালামাল ক্রয় করেছে ইসি। সংসদ নির্বাচনের আগে ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানি ব্যাগ প্রত্যেকটি এক লাখ ১৫ হাজার পিস, বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার পিস, মার্কিং সিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার পিস, অফিশিয়াল সিল আট লাখ ৪০ হাজার পিসসহ অন্যান্য নির্বাচনিসামগ্রী কেনা হয়। ওই সব নির্বাচনিসামগ্রীর বিপুল পরিমাণ রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, সংসদের পর যাতে দ্রুত স্থানীয় সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করা যায়, সেজন্য এসব মালামাল আগেই কেনা হয়েছে। কারণ নির্বাচনি মালামাল ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগে। তারা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আয়োজনে ইসিকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু কমিশন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে।
সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিয়ন ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আগে করার চিন্তা করছে ইসি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ ২০২৫ সালের ২ জুন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওই বছরের ১ জুন শেষ হয়। আর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হবে ২২ ফেব্রুয়ারি। বাকি সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়াদ ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালে শেষ হবে। তবে জনপ্রতিনিধি অপসারণ হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে। একই নিয়ম উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ক্ষেত্রেও। সংশ্লিষ্টরা জানান, ইসি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন না, কারা অংশ নিতে পারবেন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক, ঋণখেলাপি এবং খেলাপি ঋণের জামিনদাররা প্রার্থী হতে পারবেন না বলে জানিয়েছে ইসি। এছাড়া বাকি সব প্রার্থীরা আগের নিয়মে অংশ নিতে পারবে।
ইসি সূত্র জানায়, সাম্প্রতি কমিশন সভায় সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। নির্বাচন কমিশন আগামী অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো চূড়ান্ত করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
দল গুলোর প্রস্তুতি : দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসনকে কতটা নিরপেক্ষ রাখা যাবে এমন আলোচনার পাশাপাশি সংঘাতহীন সুষ্ঠু নির্বাচন ও সবার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা চলছে। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একাধিক প্রার্থী হওয়া নিয়ে আলোচনা থাকলেও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তাদের প্রার্থী নির্ধারণের কাজ গুছিয়ে আনার কাজ করছে।
সংস্দ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্দলীয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি এখনও নির্বাচন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি, যদিও তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জুবাইদা নাসরীন বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও দলকেন্দ্রিক প্রভাব সব সময় ছিল। সেই প্রভাব এবার থাকবে না, সরকারি দলের আধিপত্য থাকবে না, এটি কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, এখনও সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনাও আসেনি। কোনো পরিকল্পনা-কৌশলও জানতে পারিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন বিএনপি সরকারের ‘পরীক্ষা’।
দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় দলের তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে। যে কারণে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে।
তারা বলছেন, এরই মধ্যে দলে বলয় সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আছেন দলের সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীরা; অন্যদিকে বিগত নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া নেতা ও তাদের অনুসারীরা। এতে করে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলেও নেতাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ওইসব এলাকায় বিএনপির এমপিরা এরই মধ্যে ‘বলয়’ সৃষ্টি করেছেন।
তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়ন দেওয়ার সময় বিএনপির হাইকমান্ড থেকে বলা হয়েছিল, যারা মনোনয়ন পাচ্ছেন না তারা যেন পৌরসভা, উপজেলা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন এমপিরাই তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, স্থানীয় সরকার নিয়ে এখনো দলের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা নাই। তাই নিজেও খুব একটা কাজ করছি না। কিন্তু একটা সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। দল তখন দলের প্রার্থী হওয়ার মানদণ্ড ঠিক করে দেবে।
তিনি বলেন, আমরা তো দলীয় শৃঙ্খলার অধীন, তখন মানদণ্ড মেনেই আমরা প্রার্থি দেব। এটা নির্দলীয় বলা হলেও দলীয় নির্বাচনই, আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু করছি না, কোনো প্রতিবন্ধকতা বা ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছুই করছি না অনেকে প্রার্থী হবে বলে প্রচার করছে। আমরা মনে করি, জিতে আসার মতো প্রার্থী হতে হবে; বিএনপিও এমন প্রার্থী দেবে। এই বার্তাটা আমি দিতে চাই, তারা যেন মানুষের কাছে যায়।
সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির আশঙ্কার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন, আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। তবে সংঘাত, সংঘর্ষ হবে এটা আগেই কেন ধরে নেব?”
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর ভাষ্য, গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেভাবে বর্তমান কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু হয়েছে, তেমনি সুষ্ঠু হবে। এবার নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ আছে এবং দলীয়ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না, সে কারণে সংঘাত, সংঘর্ষের আশঙ্কা কম থাকবে।”
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ কীভাবে হবে সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সংবিধানে স্থানীয় সরকারের কথা আছে। কিন্তু স্থানীয় এমপি বা ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা যেভাবে মাতবরি করে, তাতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না।
প্রশ্ন উঠছে– আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতে যাচ্ছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইসি প্রণীত খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর মতামত দিতে গিয়ে জামায়াতের প্রস্তাব ছিল– ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান’ স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে হবে।
একই প্রতিবেদন অনুসারে, নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হচ্ছে। ফলে কোনো দলের নেতাদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই। স্থানীয় সরকারের যেসব পদে নির্বাচন হবে, সেগুলোতে প্রার্থী হতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলেই যে কেউ দাঁড়াতে পারবেন। এখানে কে কোন দলের– সেটা বিবেচনায় আনবে না ইসি।’
সর্বশেষ খবর, জামায়াতের প্রস্তাব ছাড়াই ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে জামায়াতের উক্ত প্রস্তাব নিয়ে গত রোববার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ২০২৫ সালের দলীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে গিয়েছিল তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। রিজভীও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘অন্য রাজনৈতিক দল কী বলল, সেটি বিষয় নয়। প্রচলিত আইন এবং নতুন যে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, সে অনুযায়ী কারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। বিষয়টি তাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম (বাংলা ট্রিবিউন)।’
ধরে নেওয়া যায়, ইসির প্রস্তাবিত বিধিমালায় সরকারেরও সায় আছে। নিয়ম অনুযায়ী, আচরণ বিধিমালা-সংক্রান্ত ইসির প্রস্তাবগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্ত করবে ইসি। অনস্বীকার্য, একটা নির্দলীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকারের এমন অবস্থানই নেওয়ার কথা। তা ছাড়া গত ৯ জুন সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। অতএব ইসি ও বিএনপি নেতা রিজভীর বক্তব্য নতুন কিছু নয়।
এটাও মানতে হবে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরের বছর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এরপর ইসি আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করায় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি। সেই নিষেধাজ্ঞা বিএনপি সরকারও বহাল রেখেছে। তদুপরি গত ৫ জুলাই এক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না’ (সমকাল)। আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি আয়োজিত সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘোষণাও দিয়েছেন, শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু হবে।
একই দিনে আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর নিজ কার্যালয়ে এবং ১৪ জুলাই আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণকে বিএনপির অনুমোদন বিস্ময়কর বৈ কি।
সর্বোপরি জন্মের পর থেকেই বিএনপি প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে আওয়ামী লীগকে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দুদলের সম্পর্ক কতটা বৈরী হয়েছিল, তা আমরা জানি। এমনকি একে অপরকে নির্মূলেরও চেষ্টা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি আওয়ামী লীগকে বাগে পেয়েছে বললে ভুল বলা হয় না। অথচ বিএনপি নেতৃত্ব ভালো করেই জানেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আওয়ামী লীগের জন্য হতে পারে বড় আশীর্বাদ। কারণ, এর মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মীরা জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মেলামেশার সুযোগ পাবেন। উপযুক্ত কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে অনেকে সাফল্যও পাবেন। আর অন্তত গত পাঁচ দশকের ইতিহাস বলে, যতই নির্দলীয় আবরণ থাকুক, প্রধানত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকই বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল নিয়ন্ত্রণ করেন। মূলত এরাই দল দুটোর বিশেষত জেলা-উপজেলা/থানা পর্যায়ের নেতৃত্বের পদ অলংকৃত করেন। অনেকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীও হয়েছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেও তার যথেষ্ট উদাহরণ আছে।
মোদ্দা কথা, নামে নির্দলীয় হলেও বাস্তবে অন্য প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো এ দেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আদতে দলীয় রাজনীতিকেন্দ্রিক। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগের যে তৃণমূল নেতাকর্মী পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ পরিস্থিতিতে, তারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর কারণে জেগে উঠলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।
মূলত এসব কারণেই আগামী অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা প্রকাশ হওয়ার পরপরই সেখানে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা ওঠে। আবার সরকারও এতদিন বিষয়টি স্পষ্ট করছিল না। মনে আছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুদিন আগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে প্রশ্ন করেছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রশ্নটি করেছিলেন রুমিন। কিন্তু মির্জা ফখরুল প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। রাজনীতি-সচেতন মহলে বিষয়টি কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কেউ কেউ বলছেন, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় প্রায় পুরো লাভটা বিএনপিরই হয়েছে। বিশেষত ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াতের মতো ‘ফ্রেন্ডলি অপজিশন’ পাওয়ায় সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগকে এখনও জাতীয় রাজনীতির বাইরে রাখা গেছে। একই তরিকায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে পারলে তৃণমূলের রাজনীতিতেও আওয়ামী লীগকে নিষ্ক্রিয় রাখার সুযোগ বাড়তে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে সরকার হয়তো ইসির প্রস্তাবে তেমন কিছু শর্ত যোগ করতে পারে।
রাজনীতি যেমন সম্ভাবনার শিল্প, তেমনি তাতে শেষ কথা বলেও কিছু নেই। তবে সংসদ নির্বাচনের ধারায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে তাতে আওয়ামী লীগ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষতি হবে খোদ রাজনীতির। আওয়ামী লীগ শাসনামলে নানা সুবিধা পেয়েও জাতীয় পার্টি যেমন প্রকৃত বিরোধী দল হতে পারেনি; অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও বলছে, জামায়াত কার্যকর বিরোধী দল হতে পারবে না। আর বিএনপি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের মতো ‘ফ্রেন্ডলি অপজিশন’ নিয়ে বারবার একতরফা ভোটের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকার আহাম্মকি করবে না।