
বর্ষা এলেই যে ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়, তার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা আর পরিকল্পনার ঘাটতিকে দায় দিচ্ছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব।
তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি বর্ষায় যে পানি জমে, সেটি শুধু আকাশের বৃষ্টির কারণে নয়; আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তহীনতার ফল। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পানির স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।
‘জলাবদ্ধতা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, এটি সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল। সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঢাকাকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব। ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারলে দেশের অন্য শহরগুলোর জন্যও একটি গণবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি হবে।’ গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছিলেন ইকবাল হাবিব। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।
নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গে ইকবাল হাবিব বলেন, ‘নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ, সেতু বিভাগ, নৌপরিবহন, পরিবেশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কিন্তু এদের মধ্যে সমন্বয় করবে কে সেটিই বড় প্রশ্ন।
‘বারবার বলা হয়েছে, একটি নগর সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সমন্বয়ের অভাবে সেটি হয়নি। ফলে এতগুলো সংস্থাকে একসঙ্গে নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।’ সমাধানের পথ বাতলে দিতে গিয়ে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘এখন আর নতুন করে দায়িত্ব ভাগ করার প্রয়োজন নেই। বরং সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ‘এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে ঢাকার মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারবে না। অংশগ্রহণমূলক নগর শাসনই এর সমাধান।’
ইকবাল হাবিব বলেন, পরিকল্পনা কমিশন, সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠন—যেমন ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি), ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (আইএবি), ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) এবং নাগরিকদের নিয়ে ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক হিসেবে কেবল সমস্যা জানানো দায়িত্ব নয়, সম্মিলিতভাবে সমাধানের দাবি তোলা দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, পরিবেশ আন্দোলন, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর এ বিষয়ে মতামত দিয়ে আসছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও নাগরিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বিশ্বের যেসব শহর তাদের নদী ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে- যেমন সিঙ্গাপুর; সেখানে সরকার একা নয়, নাগরিকরাও সমানভাবে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সবাই অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
‘মূল বার্তা তিনটি। সমন্বয় জরুরি, অংশীদারিত্ব অপরিহার্য এবং নাগরিকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।’ বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বাপা’র সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ ও খুশী কবির, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক স্থপতি খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের (বিআইপি) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পরিকল্পনাবিদ আনিছুর রহমান।