
কক্সবাজারে গুদাম ও ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও মাঠে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। জেলার বিভিন্ন ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কৃষকরা। কারও হাতে মিলেছে অল্প পরিমাণ, আবার কেউ ফিরছেন একেবারেই খালি হাতে। কৃষকদের অভিযোগ, চলতি আমন মৌসুমে সরকারি বরাদ্দে ঘাটতি না থাকলেও সীমান্তপথে সার পাচারের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের একাধিক সীমান্ত ও উপকূলীয় রুট দিয়ে সার চলে যাচ্ছে মিয়ানমারে। বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পরিসংখ্যানও সার পাচারের ব্যাপকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকা থেকে পাচারের সময় ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে ১১৭ জনকে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, অভিযানে যারা ধরা পড়ছে তাদের অধিকাংশই বাহক বা শ্রমিক। পাচারের নেপথ্যে থাকা মূলহোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ হাজার টন। সাম্প্রতিক সময়ে সংকট মোকাবিলায় জেলার বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ১ হাজার ৮৪৩ টন। বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ হাজার ৩৪৩ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৫০০ টন বেশি। একইভাবে ৭৮৯ টন ডিএপি সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮৮৯ টন। টিএসপি ও এমওপির বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ৪৭৫ ও ৩৬৮ টন।
টেকনাফের হোয়াইক্যাং ইউনিয়নের কৃষক কাজল উদ্দিন বলেন, তিনি প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহের জন্য একাধিকবার ডিলারদের কাছে গিয়েও পর্যাপ্ত সার পাননি।
কাজল জানান, 'সারের জন্য ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কিন্তু প্রয়োজনমতো সার পাইনি। অথচ প্রায় প্রতিদিন আমার ও পাশের ইউনিয়ন দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচার হচ্ছে।' টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কচুবনিয়া এলাকার কৃষক রমিজ উদ্দিনের অভিযোগ, বেশি জমির কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিনি বলেন, 'যাদের সার কম লাগে, তারা ঠিকঠাক পাচ্ছে। কিন্তু বেশি জমির কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। ডিলাররা কৃষক নয় এমন অনেকের কাছেও খুচরা সার বিক্রি করছেন। পরে সেই সার পাচার হচ্ছে বলে শুনছি।'
স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট সার পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উখিয়ার পালংখালীর আনজুমানপাড়া অন্যতম একটি রুট। টেকনাফের হোয়াইক্যাংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী; হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালী এলাকাও স্থানীয়ভাবে পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত।
এর বাইরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও তুমব্রুসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকাও পাচারের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। স্থলপথের পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রপথেও সার পাচার হচ্ছে। অভিযানে মাঝেমধ্যে সারবোঝাই ট্রলার ও কার্গো বোট আটক করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩ হাজার ২৫২ বস্তা বা ১ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭২ জনকে আটক করে নয়টি মামলা করা হয়। অন্যদিকে সীমান্তে বিজিবির বিভিন্ন ইউনিটও বিপুল পরিমাণ সার আটক করেছে। জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৪ বিজিবি জব্দ করেছে ৫০ হাজার ৪০০ কেজি, ১১ বিজিবি ২ হাজার ৯০০ কেজি, ৩০ বিজিবি ৫ হাজার কেজি, ২ বিজিবি ৭০০ কেজি এবং ৩৪ বিজিবি ১৪ হাজার ৩০৮ কেজি সার। এসব ঘটনায় উখিয়া ও টেকনাফ থেকে ৪৫ জনকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে।
সার পাচারের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বড় অংশই সাধারণ বাহক বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন বলেন, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলায় মূলহোতাদের আসামি করার চেষ্টা করা হয়। এরপর তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার।
টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, অভিযানে হাতেনাতে আটক ব্যক্তিদের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের আসামি করা হয়েছে। নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্তের বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব।
উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে স্থলপথে নজরদারি বাড়ানোর পর পাচারকারীরা জলপথ ব্যবহার করছে। যারা আটক হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে অর্থের জোগানদাতারা মাদক কারবারে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে বর্তমানে বাংলাদেশি টাকার প্রচলন না থাকায় সরাসরি অর্থের বিনিময়ে পণ্য কেনাবেচা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সীমান্তপথে চোরাচালানে বাড়ছে পণ্য বিনিময় বা 'বার্টার' ব্যবস্থা।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে সারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের বিপরীতে মিয়ানমার থেকে মাদক ও অস্ত্র ঢুকছে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সার পাচারে জড়িত চক্রই ইয়াবা ও আইসসহ বিভিন্ন মাদক পাচারে জড়িত। অর্থ লেনদেনের সুযোগ না থাকায় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এসব চোরাচালান চলছে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, সীমান্তের একই চক্র মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার ও সার পাচারের সঙ্গে জড়িত। সারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের বিনিময়ে মাদক বা অস্ত্র দেশে ঢোকার তথ্য রয়েছে।
সার পাচারের সঙ্গে মাদক চোরাচালানের যোগসূত্রের অভিযোগের মধ্যেই কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা আটকের তথ্য সামনে এসেছে।
জেলার ১০ উপজেলায় জুন থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার মাসে বিজিবি, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৭৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৫ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সীমান্তে পণ্য বিনিময়ভিত্তিক চোরাচালান বাড়ায় একদিকে দেশের কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে এর বিনিময়ে দেশে ঢুকছে মাদক ও অস্ত্র। সার পাচারের অভিযোগের সঙ্গে জেলার কিছু ডিলারের নামও উঠে এসেছে। কৃষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চক্র কৃষকদের ব্যবহার করে ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করে পরে তা সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যায়।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পাচারকারী চক্র সরাসরি সামনে না এসে কৃষক, নৌকার মাঝি, সীমান্তের বাসিন্দা ও অন্যান্য সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করছে। পরে উপকূলীয় এলাকায় সার মজুত করে সুযোগ বুঝে তা নৌপথে পাচার করা হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার বলেন, সার পাচারের অভিযোগে প্রায় এক ডজন মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ডিলারের নামেও মামলা রয়েছে। পাচার রোধে এখন কৃষকদের সার দেওয়ার সময় বস্তা খুলে দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তদন্তে সীমান্তবর্তী এলাকার ১০ থেকে ১২ জন ডিলারের বিরুদ্ধে সার পাচার ও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কয়েকজন ডিলারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, জেলার চাহিদার তুলনায় চলতি মৌসুমে সরকার বেশি সার বরাদ্দ দিয়েছে। তাই সরকারি বরাদ্দের ঘাটতির কারণে সংকট হওয়ার কথা নয়। তার মতে, নানা অনিয়মে জড়িত কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এবং অনিয়মে জড়িতদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সার বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে কক্সবাজারের ৭১টি ইউনিয়নে নতুন করে একজন করে ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।