
দীর্ঘ দিন ধরেই সীমান্তে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী-বিএসএফ। সবশেষ দিনাজপুর, ঝিনাইদহ ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে ২২ জনকে পুশইনের চেষ্টা রুখে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গতকাল শনিবার ভোরে এই তিন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। এ ঘটনার পর সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
দিনাজপুরে সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা : দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে ভারত থেকে ৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিরামপুর উপজেলা ভাইগড় সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। ঘাসুড়িয় বিওপির কোম্পানি কমান্ডার টি আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, শনিবার ভোরে ঘাসুড়িয়া সীমান্তের ওপারে ভারতীয় শ্রী রামপুর এলাকার ২৯১ পিলারের ২০-এস এলাকা দিয়ে তাদের পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এ সময় বিজিবি সদস্য ও গ্রামবাসীর প্রতিহতের ফলে তাদের সরিয়ে নেয় বিএসএফ সদস্যরা। পরে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বিএসএফ সদস্যরা জড়ো হতে থাকেন। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। ফলে পুশইন চেষ্টা প- হওয়ায় তারা আবারও ভারতে ফিরে যায়। স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব আব্দুল আজিজ বলেন, ভোরে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বাঁশির শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠি। বাড়ি থেকে বাহিরে এসে দেখি ৯ জন মহিলা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এ সময় গ্রামবাসী তাদের প্রতিহত করে। স্থানীয় কাটলা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য শুকুর আলী জানান, শনিবার ভোরে ভাইগড় সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যরা ৯ জন নারীকে জোর করে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। পরে গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা তাদের প্রতিহত করেন। সকালে ওই এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে ভাইগড় বিওপির কোম্পানি কমান্ডার টি আলম জানান, ভারত থেকে অবৈধ পথে ৯ নারীকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে বিএসএফ। পরে বিজিবি সদস্যরা তাদের ভারত সীমান্তে ফেরত পাঠায়। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে কোনো ভারতীয় নারী যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সেই লক্ষ্যে বিজিবি টহল বৃদ্ধি করেছে।
ঝিনাইদহের সীমান্তে ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা ঠেকাল বিজিবি : ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ছয় নারী-পুরুষকে পুশইন করার চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী-বিএসএফ। তবে তাদের সে চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। গতকাল শনিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটেছে। পরে ব্যক্তিরা সীমান্তের শূন্য রেখার ভারতীয় অংশে বসে আছে বলে জানিয়েছেন বিজিবির মহেশপুর ৫৮ ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মুন্সি এমদাদুর রহমান। পরে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি জানায়, বিএসএফর ৯ ব্যাটালিয়নের অধীন সিঙ্গামোড়া ক্যাম্পের একদল বিএসএফ সদস্য ভোর ৫টার দিকে ছয়জনের অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির একটি দলকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে। তবে বিষয়টি সামন্তা বিজিবি ক্যাম্পের টহল দলের নজরে আসলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ প্রতিহত করে। তাদের জিরো লাইন থেকে হটিয়ে দেয়। বিজিবির পক্ষ থেকে বিষয়টি বিএসএফকে জানানো হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়েছে।
ফেনীর সীমান্তে ৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ : ফেনীর পরশুরাম সীমান্ত দিয়ে সাতজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফেনী ব্যাটালিয়নের (৪ বিজিবি) অধীন শ্রীপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ২১৪৫-এর নিকটবর্তী দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে ভারতের ৪৩ রাজনগর বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহল দল সাতজন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। যাদের মধ্যে ছয়জন নারী এবং একজন ছেলেশিশু রয়েছে। বিষয়টি সীমান্তে টহলরত বিজিবি সদস্যদের নজরে এলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কৌশলগত অবস্থান নেন এবং অনুপ্রবেশে বাধা দেন। বিজিবির কঠোর ও সুদৃঢ় অবস্থানের কারণে বিএসএফ সদস্যরা ওই সাতজনকে নিয়ে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিজিবি জানিয়েছে, পুশইনের শিকার হওয়ার উপক্রম হওয়া ওই সাতজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সবাই ভারতীয় নাগরিক। ঘটনা চলাকালীন কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিজিবি ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবি সদস্যরা তা প্রতিহত করেন।’ অধিনায়ক আরও বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন কিংবা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে পুশইনের নানান অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব নিয়ে সীমান্তে যখন নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন বিজিবি স্পষ্ট করেছে যে, তারা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।