ঢাকা বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও নবজাগরণ

কাজল রশীদ শাহীন
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও নবজাগরণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। ২০২৪ এর ৩৬ জুলাই অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটে এ জাতির জীবনে, এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে। অবশ্য, ঘটনাটি অভূতপূর্ব হলেও অভাবিত নয়। কেন অভূতপূর্ব, আর কেনই বা অভাবিত নয় তার একটু ব্যাখ্যা হাজির করা যাক।

অভূতপূর্ব এই কারণে যে বাংলাদেশের জনগণ বা এই ভূখণ্ডের মানুষেরা অভ্যুত্থানের সঙ্গে পূর্ব থেকে পরিচিত হলেও ঠিক এরকম অভ্যুত্থান তারা দেখেনি কখনও। বদরুদ্দীর উমর ২০২৪ এর ২৮ জুলাই দৈনিক পত্রিকা বণিক বার্তার আনিকা মাহজাবিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই ভূখণ্ডে পাঁচটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সেগুলো হল- ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৫ ও ১৯৯০। তখনও ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হয়নি। সর্বজনে গণঅভ্যুত্থানের কথা বললেই ১৯৬৯ ও ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানই হাজির থাকতো ওই দিন পর্যন্ত। গবেষক বদরুদ্দীন উমরের কথামতো ওই পাঁচটি গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানকে যুক্ত করলে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সংখ্যা হয় ছয়টি। তারপরও আমরা বলছি ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান এই অঞ্চলে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানগুলোর মধ্যে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

আমরা মনে করি, এর কারণ ২০২৪ এর বা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গঠন ও তাৎপর্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছাড়া অন্যসব গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে যদি বদরুদ্দীন উমরের কথানুযায়ী অভ্যুত্থান বলে মান্যতা দেওয়া হয়, তা হলে দেখা যাবে সেই অভ্যুত্থান ছিল একটা অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। সেই সরকার আদতে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি ছিল না। কেন্দ্রে তো ছিলই না। উপরন্ত সেদিনের পূর্ববঙ্গে যে সরকার ছিল তাও ছিল ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের একটা ধারাবাহিকতার ক্ষুদ্র সংস্করণ বিশেষ।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ১৯৭১-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই সময়ের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে। বদরুদ্দীন উমরের কথা মতো ১৯৭৫-এর ক্ষমতার পট পরিবর্তনকে যদি অভ্যুত্থান বলা হয়। তা হলে সেই অভ্যুত্থান যে ছিল সামরিক অভ্যুত্থান ছিল তা স্পষ্টত। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানও ছিল সামরিক শাসক এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে।

কিন্তু ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ছিল শেখ হাসিনার ভোটবিহীন সরকারের বিরুদ্ধে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় শেখ হাসিনা কিন্তু সামরিক শাসক ছিলেন না। রাজনৈতিক দলের প্রতিভূ ছিলেন। কিন্তু তিনি স্বৈরতান্ত্রিকতা বা স্বৈর আচরণকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা ছিল সামরিক সরকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর ও প্রাণ সংহারী। কোন রাজনৈতিক দল যদি স্বৈরাচার হয়ে ওঠে তা হলে সেই নেতা-নেত্রী ও দেশ ও জাতির কতোটা জগদ্দল পাথর হয়ে বসতে পারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৫ বছরে তা নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক সরকারের অনেক সীমবদ্ধতা থাকে, কারণ তাদের আগমন ঘটে ক্যান্টনমেন্টের মতো একটা বদ্ধ জায়গা থাকে। ব্যারাকই তাদের দুনিয়া। ফলে, শাসনক্ষমতায় তারা রুঢ় হলেও সর্বত্র নিজেদেরকে ছড়িয়ে দিতে পারতেনা না। কিন্তু শেখ হাসিনার জন্য বিশেষ সুবিধার জায়গা হল, তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মতো দেশের প্রধানতম একটা রাজনৈতিক দলের প্রধান। ফলে, সেই দল যখন ভোট হরণকারী, মানবতা লূণ্ঠিত, দুর্নীতিসর্বস্ব একটা স্বৈরশাসকে পরিণত হয়, তখন জনগণের পক্ষে অভ্যুত্থান ঘটানো ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। যেমনটা দেখলাম আমরা ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যেভাবে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিল তাদেরকে পরাস্ত করা রীতিমতো দুরুহ একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা আমরা পনের বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছি। দীর্ঘ এই সময়ে নিজেদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও স্বৈরাচাররূপে গড়ে তুলেছিল। স্বৈরতন্ত্র তখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও কায়েম করা হয়েছিল।

এ কারণে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান অন্যসব গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। পূর্বেকার অভ্যুত্থানগুলোর অভিজ্ঞতা হল, রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান ভূমিকা রেখেছে সেটা সংঘটনে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সেইসব ছাত্রদের সবারই রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্য ছিল। এবং মূল দলের সঙ্গে যূথবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে উনারা অভ্যুত্থানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে।

কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বৈশিষ্ট্য একেবারেরই ভিন্নধর্মী। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে বা অগ্রভাগে যারা ছিলেন তাদের কারোরই সেই অর্থে রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না, থাকলেও সেটা উচ্চকিত নয়। এঁরা কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কিংবা কোনো ছাত্র সংগঠনের তরফে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি।

আমরা মনে করি, এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছাত্রদের তরফে স্বতস্ফূর্ত নেতৃত্ব দেওয়া এবং যার যার জায়গা থেকে যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে গণমুখী করে তোলা। সম্ভবত এ কারণেই বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে, কোটাকে অপসারণের দাবিতে এই আন্দোলন ছাত্রদের দ্বারা সংঘটিত হলেও দ্রুতই তা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তির জায়গা ছিল, ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ স্পৃহা। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকি সবদলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এভাবে সংঘটিত হয়েছিল বলেই ৩৬ জুলাই একজন রাজনৈতিক স্বৈরাচারের পতন ও পলায়ন দেখেছে বাংলাদেশ। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত এই অভ্যুত্থান আক্ষরিক অর্থেই এদেশের জন্য অভূতপূর্ব ও তাৎপর্যবাহী একটা ঘটনা।

২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের দিনগুলোতে ছাত্র-জনতা জীবনবাজি রেখে ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলনে যদি শরিক না হতো তা হলে বাংলাদেশ আজ যে নতুন আকাঙ্ক্ষার পথে হাঁটছে তা আদতে কোনদিন সম্ভব হতো কিনা, তা বলা দুরুহ। কারণ ক্ষমতায় ছিল রাজনৈতিক স্বৈরাচার। যারা সহজেই দেশব্যাপী জারি রাখতে পেরেছিল স্বৈরতন্ত্রের কালাকানুন, গুম-খুনের মতো অসাংবিধানিক ও অন্যায্য কর্মকাণ্ড। দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পদে বসানো হয়েছিল তাদেরই তল্পিবাহকদের। সেখানে থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব ছিল বৈকি।

জাতি হিসেবে আমরা নিশ্চয় ভাগ্যবান যে, ছাত্রসমাজ আমাদেরকে নিরাশ করেনি, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। ফ্যাসিস্টের সেই দিনগুলোতে বিশেষ করে ২০২৩ এর শেষাশেষি এবং ২০২৪ এর শুরুর দিনগুলোতে দেয়ালে কান পাতলে এমন কথাও শোনা গেছে, যা রীতিমতো শিহরিয়ে ওঠার মতো। শাহবাগ-কাঁটাবনের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ও আলাপে উক্ত হয়েছে যে, দেশ দ্রুত একদলীয় গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। ২০২৪ এর জাতীয় নির্বাচনকে যদি গত দুই নির্বাচন- ২০১৪ ও ২০১৮ এর মতো কোনভাবে ম্যানেজ করে ফেলা সম্ভব হয়, তা হলে ২০৩০ এর শেষাশেষি চীনের রাজনৈতিক মডেলের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ। আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজ ও দেশপ্রেমিক জনতা বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে সেই বিপদের হাত থেকে। একদলীয় গণতন্ত্রের আশু বিপদ থেকেও দেশ হয়েছে মুক্ত। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের যে কয়েকটা অভিজ্ঞতা রয়েছে এর মধ্যে এই গণঅভ্যুত্থান উপর্যুক্ত কারণে অভূতপূর্ব এক ঘটনা।

এই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, জুলাই গণঅভ্যুত্থান অভূতপূর্ব হলেও অভাবিত নয়। কেন বলেছিলাম একথা, কারণ আমাদের গণঅভ্যুত্থানের অতীত গৌরবের। এই জাতি- এই মাটির মানুষেরা হয়তো অন্যায় সহ্য করে, ক্ষেত্রবিশেষে হয়তো মেনেও নেয়, কিন্তু মনে নেয় না কখনও। এ কারণে এখানে কিছুদিন পর পর গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ছাত্র জনতরা বুকের রক্তে লাল হয় রাজপথ।

ইতিহাস বলে এই মাটির মানুষেরা অন্যায়কারী, শোষক, জালিম, অসভ্য-বর্বরকেও সংশোধনের সুযোগ দেয়। ভুলকে ক্ষমার মাহাত্ম্য দিয়ে জয় করে নিতে চাই। কিন্তু সেই ভুল থেকে যদি শিক্ষা না নেয়, অন্যায় থেকে যদি সংশোধিত না হয় তা হলে তাকে শাস্তি দিতে কসুর করে না। যেমনটা দেখেছি আমরা দূর কিংবা নিকট অতীতে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও যেটা দেখা গেল আক্ষরিক অর্থেই স্পষ্ট করে। এ কারণেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান বৈশিষ্ট্যে ও বিশিষ্টতায় অভূতপূর্ব হলেও এ জাতির কালিক বিচারে অভাবিত নয় মোটেই।

এখন প্রশ্ন হল, আমাদের গণঅভ্যুত্থানের এরকম সোনালী অতীত থাকার পরও কেনো মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক সুবিচার-নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যায় না? কেনো আমরা গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খায় বারংবার? জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদেরকে সুযোগ দিয়েছে নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের। আমরা কি সেই কাজটা যথাযথভাবে করতে পারব, নিদেনপক্ষে সূচনাটুকু? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বছর পূর্তিতে আমরা কি আশাবাদের কোনো জায়গা দৃশ্যমানভাবে হাজির-নাজেল হতে দেখছি?

আমাদের সংকটটা আসলে কোথায়, সেটা চিহ্নিত করা এবং দূর করার লক্ষ্যে কাজ করা কি, নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে জরুরি নয়? আমরা মনে করি, আমাদের সংকটটা আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায়। সেখানে আমরা কার্পেটের তলায় সব আবর্জনা (পড়ুন সংকট) লুকিয়ে রেখে সমাধানের পথে হাঁটছি, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছি।

আমরা এমনই একটি জাতি, যারা নিজেদের নবজাগরণকেই চিহ্নিত করেনি, যাপিত জীবনের অংশ নিতে পারেনি। ফলে, আমাদের হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো অর্জন থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী চর্চায় ও যাপনে সেই আলোকায়ন নেই। যে আলোকায়ন আমাদেরকে গণতন্ত্রী করবে, সুশাসন ও মুক্ত গণমাধ্যম দেবে, সামাজিক সুরক্ষায় রাখবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে হাঁটবে, মানবিক বাংলাদেশকে সর্বাবস্থায় দৃশ্যমান রাখবে। যা নিশ্চিতে নবজাগরণ হতে পারে আমাদের আশ্রয়, বাঙালি মুসলমান, বাংলাদেশীর জন্য কোড অব লাইফ। এ কারণে বোঝা দরকার বাংলাদেশের নবজাগরণকে। এখন আসুন উন্মীলন করা যাক, বাংলাদেশের নবজাগরণের ভেতর-বাইরের স্বরূপ ও সংজ্ঞা।

দুই.

নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বললেই আমাদের মনে পড়ে ইউরোপীয় নবজাগরণ কিংবা ইতালীয় নবজাগরণের কথা। এরপর হাজির হয় বেঙ্গল রেনেসাঁ। বেঙ্গল রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণ যখন নানাবিধ সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপে অস্তায়মান তখন শুরু হয় বাংলাদেশের নবজাগরণ। যার ভরকেন্দ্র ছিল ঢাকা। পরিধি ছিল ১৯০৫-এর বঙ্গ বিভাজন কালের পূর্ববঙ্গ। যে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে লর্ড কার্জন চেষ্টা করেছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী থেকে বেরিয়ে পৃথক একটা প্রদেশ গঠনের। যে চেষ্টা রহিত হয় ১৯১১-তে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনা কখন শুরু হয় তা নির্দিষ্ট করে বলা মুস্কিল। আমরা মনে করি, এর উন্মেষ ঘটতে থাকে ঊনিশ শতকের শেষাশেষিতে। বঙ্গ বিভাজনের চেষ্টা ও রদ করার ঘটনা এর উন্মেষকে দ্রুততর ও অনিবার্য করে তোলে। যার প্রেক্ষাপটে পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও বিকাশের দিকটা এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগ্রত হতে থাকে। এই জাগ্রত হওয়ার সময় ১৯২১-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যা বাংলাদেশের নবজাগরণের যথার্থ উন্মেষ ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আমরা মনে করি, সেদিনের পূর্ববঙ্গের ঢাকায় খ্রিস্টাব্দ ১৯২১ থেকে বাংলাদেশের নবজাগরণ শুরু হয় এবং তিন পর্বে সেটা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯২১-এ বাংলাদেশের নবজাগরণের শুরু হলেও সলতে পাকানোর কাজটা শুরু হয় ঊনবিংশ শতকের শেষাশেষি থেকে। বাংলাদেশের নবজাগরণ তিনটা পর্ব বা পর্যায়ে সংঘটিত হয়।

প্রথম পর্ব ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ অবধি।

দ্বিতীয় পর্ব ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ অবধি।

তৃতীয় পর্ব ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১।

প্রথম পর্বে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই নবজাগরণকে শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি প্রয়োজনানুগ নেতৃত্ব দিয়ে এর কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের প্রথম পর্বের নায়করা সংগঠিত হন ‘শিখা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সাহিত্য সমাজের সংঘবদ্ধতায়। দ্বিতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, বাংলা ভাষার ন্যায্য মর্যাদার প্রশ্নে। তৃতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন স্বাধীকার আন্দোলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষায়।

মধ্যযুগে বা চতুর্দশ শতকে ইতালীয় বা ইউরোপের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপ জুড়ে অনেকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অবশ্য সেই সময়ের ঘটনাবলী ও বাস্তবতা ছিল একেবারে ভিন্ন। এ কারণে মোটাদাগে বিষয়টাতে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হলেও বাংলাদেশের নবজাগরণের সার্থকতা ও বিরল-ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো, এ জাগরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে তৃতীয় বিশ্বের একটা ভূখণ্ডকে সিকি শতাব্দীর মধ্যে দুইবার এবং দ্বিতীয়বার সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনারহিত। বাংলাদেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁকে যদি ইতালীয় বা ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোকে অন্বেষণ করা হয়, তাহলে এই নবজাগরণের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা দুরুহ হতে পারে। দেখা দিতে পারে দ্বিধান্বিত ও বিভ্রান্ত হওয়ার শঙ্কা। প্রত্যেকটা রেনেসাঁয় স্বতন্ত্র ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। কোন রেনেসাঁয় অপর কোন রেনেসাঁর সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে সাযুজ্য ও সঙ্গতির্পূ হবে এমন কোন কথা নেই। কেননা স্থান, সময়, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মের প্রভাব, ঐতিহ্যচেতনাসহ সবকিছুই পৃথক ও তাৎপর্যও ভিন্নতর। আমরা শুধু আলোকপাত করতে পারি তার গড়ন, গতিপ্রকৃতি, লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার ওপর।

ইতালীয় রেনেসাঁ যেমন পুরো ইউরোপকে আলোড়িত করেছিল। বঙ্গীয় রেনেসাঁ কলকাতায় সংঘটিত হলেও তার ছোঁয়া লাগেনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। ভারতীয় ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার বেঙ্গল রেনেসাঁর যে তিনটি দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে এটিকে প্রধানতম বলে বিবেচনা করেছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের শক্তি হলো এটি ঢাকায় সংঘটিত হলেও তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে প্র্রথম পর্বে পুরো পূর্ববঙ্গে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে তদানীন্তন পুরো পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে।

আমাদের স্মরণে রাখা জরুরি যে, আমাদের আজকের যে বাংলাদেশের মানচিত্র, সেটা পাকিস্তানের সময়ে পূর্বপাকিস্তান, পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ নামে একই রকম ছিল। কিন্ত ব্রিটিশ শাসনের সময় বঙ্গবিভাজনের মধ্যে দিয়ে যে পূর্ববঙ্গকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই পূর্ববঙ্গ কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে হুবহু এক নয়। ফলে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনায় বা উন্মেষপর্বে শুধু বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানরাই যুক্ত হননি, অবিভক্ত বঙ্গের বাঙালি মুসলমান মাত্রই যুক্ত হয়েছিলেন। বিশেষত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান।

হাসান হাফিজুর রহমানের এক লেখায় এ কথার কিছুটা ইঙ্গিত মেলে। তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকা প্রকাশের কারণ সম্পর্কিত এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘পাকিস্তানের আগে বাঙালী মুসলমান স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় উত্তেজিত ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পরেই দেখা গেল স্বাতন্ত্র্যই মুক্তি নয়। দুর্বল বাঙালী ন্যাশনালেটি প্রবল পাঞ্জাবী ন্যাশনালেটির বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জায়গায় নতুনভাবে দেখা দিল আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।’

এ ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’ই হলো বাংলাদেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রতিপাদ্য বিষয়। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মানবতাবাদ, ইহজাগতিকতা, উদারনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় কুসংস্কার মুক্তি, ঐতিহ্যলগ্নতা ও তার যৌক্তিকতা, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার চর্চা, ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ ও সম্পদের সুষম বণ্টনের প্রত্যাশা পূরণ।

বাংলাদেশের নবজাগরণের শুরু ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। এই সূত্রে সেই সময়ের বিদ্বৎসমাজের একট বড় অংশের এখানে বসবাস ও একত্র হওয়ার সুযোগ ঘটে। যার কল্যাণে ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। যার মুখপাত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। যাদের স্লোগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। উল্লেখ্য, মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ছিল ‘ইউরোপের নবজাগরণ-ইতালীয় রেনেসাঁ, উনিশ শতকের নবজাগরণ-বঙ্গীয় রেনেসাঁ, তুরস্কের নবজাগরণ-কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে সংঘটিত মুসলিম রেনেসাঁ।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর নেতেৃত্বেও অগ্রভাগে যারা ছিলেন উনাদের অন্যতম হলেন আবুল হুসেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন অনেকেই। উল্লেখযোগ্য হলেন : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ প্রমুখ।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জানাচ্ছেন, বয়সে ও শরীরে বড় হয়েও কোনো কোনো মানুষ শিশু থেকে যেতে পারে। শুধু মানুষ না, কোনো কোনো জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এই সত্য। তারা হাজার বছরের হয়েও জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, চিন্তা-চেতনায় শিশু থেকে যায়। সায়ীদ স্যারের এ কথার নির্যাস নিয়ে কি বলা যায়, আমরা যদি প্রকৃতার্থেই সাবালকত্ব অর্জন করতে চাই তা হলে আমাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশকে নবজাগরণের পথে হাঁটতে হবে। যে আকাঙ্ক্ষার বীজ রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার গভীরে।

তিন.

রাজা যায় রাজা আসে জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। এরকম একটা সংলাপে কার্টুনিস্ট এম. এ. কুদ্দুস একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে জনগণের পক্ষে একজন জ্যোতিষি হাত দেখাতে গিয়ে উপর্যুক্ত সংলাপটা আওড়াচ্ছেন। এর উত্তরে জ্যোতিষি বলছেন, রাজা কী করবে, তোমার হাতে তো রেখায় নেই। ভাগ্য পরিবর্তন হবে কীভাবে? অর্থাৎ হাতে রেখা নেই বলে জনগণের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন হয় না বা হচ্ছে না আজোবধি। জ্যোতিষিও যে ফ্যাসিস্ট হতে পারে ওই সংলাপে কুদ্দুস সেটাই বুঝিয়েছিলেন?

ঠিক একই ভাবে আমরা তো একথাও বলতে পারি, ‘স্বৈরাচার যায় স্বৈরাচার আসে, জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।’ মাঝখানে অভ্যুত্থান নিয়ে যায় আমাদের সোনার ছেলেদের। শহিদের সংখ্যা বাড়ে। তবুও গণতন্ত্র থেকে যায় ‘সোনার পাথরবাটি’ রূপে। আমাদের গণতন্ত্র যেন ‘সোনার হরিণ’। তাকে পাওয়ার জন্য আমরা জীবন দিই, মিছিলে নামি। তবুও সে অধরা থেকে যায়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আমরা কায়মনে এই প্রার্থনা জারি রাখতে চাই, আমাদের সকল আশঙ্কা দূর হোক। আমরা সত্যসত্যই নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের পথে হাঁটি। এই মাটির সব শহিদদের আত্মাকে শান্তি দিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ ছাড়া এ মুহূর্তে আমাদের আর কোন চাওয়া নেই। কেননা, বাংলাদেশ দাঁড়ালেই আমরা দাঁড়াব। বাংলাদেশের মুক্তি ঘটলেই আমাদের মুক্তি ঘটবে।

‘এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা/ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আছে যত সব আশা।’ আমাদের আশা এখন একটা নবজাগরণের আলোয় নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণ। যেখানে ধ্বনিয়া উঠিবে-দৃশ্যমান হবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার মন্ত্র-সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মুক্ত এক বাংলাদেশ।

লেখক : চিন্তক, গবেষক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত