ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সৌদিতে অগ্নিকাণ্ড

১৬ বাংলাদেশি পরিবারের স্বপ্ন পুড়ে ছাই

* পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ পরীক্ষা * লাশ দেশে আনার প্রস্তুতি
১৬ বাংলাদেশি পরিবারের স্বপ্ন পুড়ে ছাই

ইচ্ছেপূরণের স্বপ্নগুলো শুধু সত্যি হতে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। সৌদি আরবে সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ পরিবারের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। একসময় যাদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনতেন পরিবারের সদস্যরা, এখন তাদের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ স্বজনরা। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

গত রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)। আত্রাই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০)। এ ছাড়া নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮) নিহত হয়েছেন।

গন্ডগোহালী, উজানপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনদের কান্না দেখে সান্ত¡না দিতে আসা মানুষগুলোর চোখও ভিজে উঠছে। একে অন্যকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

গন্ডগোহালী গ্রামের নিহত মোহন ও সুমনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের মা ময়না খাতুন বলেন, বড় ছেলে গেছে সাত বছর হলো, আর মেজো ছেলে গেছে দুই বছর। কোনো দিনই ছুটিতে আসেনি। ছেলে বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি। বাড়ির কাজ শুরু করেছি। বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ করব। বাড়ি এসে বিয়ে করব মা। মেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করব। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।

একই গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, তার ছেলে নয় বছর আগে সৌদি আরবে যান। সাড়ে ৬ বছর পর ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। এরপর ছেলেকে বিয়ে দেন। বিয়ের পর আবার সৌদি আরবে চলে যান রুবেল। সেখানে যাওয়ার দুই বছর পর আবার বাড়িতে আসেন। ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে তিন মাস আগে তিনি আবার সৌদি আরবে যান।

সাইদুর বলেন, সৌদি আরবে গিয়ে তার ছেলে সোফা তৈরির কাজ করতেন। তার আর দুনিয়ার বুকে কেউ রইল না। তার নাতনি হয়েছে মাত্র ১৪ দিন আগে। ১৪ দিনের সন্তানকে রেখে ছেলে চলে গেল। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে অসহায় পরিবার উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ফরিদ শেখকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দেড় বছর আগে ফরিদ সৌদি আরবে যান।

ময়েন শেখ বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে তারা অনেক ঋণের মধ্যে পড়েছেন। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলত। এখন ঋণ শোধ করবেন কীভাবে, সংসারই বা চালাবেন কীভাবে- এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।

ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানায় থাকা শ্রমিকরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

তিনি বলেন, ওই কারখানার শ্রমিকরা দিনের বেলায় ঘুমাতেন এবং রাতে কাজ করতেন।

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরিটি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাদের লাশ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দেশে আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ পরীক্ষা : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশি কর্মীর পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হবে; প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষাও করা হবে।

গত রোববার দুপুর আনুমানিক ২টায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে মোট ১৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় রাত ১১টায় উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।

প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

দূতাবাস জানায়, কারখানাটির একমাত্র জীবিত কর্মী হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে তিনি চুল কাটানোর জন্য সেলুনে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি কারখানায় আগুন জ্বলতে দেখতে পান।

হাবিবুরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন ওই কারখানায় মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডে তাদের মধ্যে ১৬ জনই ঘটনাস্থলে মারা যান। স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে এবং অপর আটজন কালো ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান। নিহতরা কারখানার একটি অংশে বসবাস করতেন।

দূতাবাস জানায়, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের সবার পাসপোর্ট ও ইকামা পুড়ে গেছে। এ কারণে মৃতদের পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট শিফা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফয়সাল আলউতাইবি জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয়সংক্রান্ত ডকুমেন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রথমে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃতদের অনুকূলে মৃত্যু সনদ ইস্যু করবে।

এরপর লাশগুলো সৌদি আরবে দাফন অথবা বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে নিহতদের পরিবারের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাস এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ ও পরবর্তী প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে।

সৌদিতে নিহত ১৬ বাংলাদেশির লাশ দেশে আনা হবে : সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত ১৬ বাংলাদেশির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বার্তায় এ তথ্য জানায়। বার্তায় উল্লেখ করা হয়, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত শেষ হলে তাদের পরিবাবের সম্মতি অনুসারে লাশ দেশে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে। গত রোববার সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত