ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের সঙ্গে বৈঠকে সরকারপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, ‘আজ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫ কোম্পানি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি আশা করি, এই সফর আমাদের সম্ভাবনা সম্পর্কে আপনাদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেবে। ‘রাজনীতিতে প্রবেশের আগে আমিও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম। আমি শিখেছি যে, ব্যবসার বিকাশের জন্য সঠিক নীতি এবং পরিবেশ প্রয়োজন। আজ আমার বার্তাটি সহজ। আমাদের ৬ মাস বয়সি দূরদর্শী সরকার চায় আমেরিকান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করুক। আমরা আপনাদের পুঁজি, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে স্বাগত জানাই। আমরা আপনাদের সাফল্যকে সহজতর করতে এখানে আছি এবং এটাই আপনাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত অঙ্গীকার।’ বিনিয়োগ সস্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, কিন্তু আমাদের উল্লেখযোগ্য শক্তিও আছে। আমাদের একটি বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান বাজার, একটি তরুণ ও পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী এবং একটি কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। আমাদের সরকার নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, ব্যবসাবান্ধব বাজেট এবং উদার অর্থনৈতিক ও রাজস্ব নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

“আমাদের লক্ষ্য, একটি নিয়মভিত্তিক, বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত এবং বেসরকারি খাত দ্বারা চালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। আমরা চাই আমেরিকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এই রূপান্তরে অংশীদার হোক। জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা, অর্থায়ন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন এবং লজিস্টিকস খাতে আমাদের পারস্পরিক সুযোগ রয়েছে। আমাদের সরকারকে আপনার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুন। আমরা শুনতে, সাড়া দিতে এবং সহায়তা করতে এখানে আছি।’

সরকার আরো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে মনোনিবেশ করছে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, আমরা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা জোরদার করছি, নিয়মকানুন সহজ করছি, কর ও ভ্যাট প্রশাসন উন্নত করছি, মুনাফা দেশে ফেরত আনা সহজ করছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাচ্ছি এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে ডিজিটাল করছি। আমরা অবকাঠামো, বন্দর, লজিস্টিকস এবং জ্বালানি নিরাপত্তাও উন্নত করছি।

‘পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছি। সরাসরি বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পরামর্শক সেবার মাধ্যমে হোক, আমাদের জাতি গঠনে আপনাদের অবদানকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়।’

বর্তমান সরকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সমন্বিত করতে চায় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি উৎপাদন এবং বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছি। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নয়, বরং একটি টেকসই ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আপনাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গড়ে তুলতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আসুন আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করি এবং আপনাদের কোম্পানিগুলোর সমৃদ্ধ উপস্থিতি নিশ্চিত করি।

‘আসুন আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাই এবং একটি সমৃদ্ধ, প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আমি আপনাদের সবার সফল সফর কামনা করছি। আমার সরকার আপনাকে সর্বতোভাবে সমর্থন করতে প্রস্তুত।’

ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট অতুল কেশাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অলিভার সিম্পসন।

প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন- মাস্টারকার্ডের গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ও ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি অপারেশন্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রবি অরোরা, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানা, মেটার দক্ষিণ এশিয়ার পাবলিক পলিসি পরিচালক চা ইউয়েন টিং, মেটা বাংলাদেশের হেড অব পাবলিক পলিসি রুজান সারওয়ার, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক কেভিন রোপকে, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের বাংলাদেশ কান্ট্রি টিম লিড খবিবুর রহমান, ভিসার ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান আনন্দ বিজয় ঝা এবং ভিসার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ।

বৈঠকে বক্তব্য দেন বোয়িংয়ের দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতের প্রেসিডেন্ট এবং বোয়িং গ্লোবালের ভাইস প্রেসিডেন্ট সলিল গুপ্তে, শেভরন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রেসিডেন্ট শু শিয়ং, মেটলাইফের বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, নেপাল ও ভিয়েতনাম অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এলেনা বুতারোভা, উবারের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিলেশনস বিভাগের প্রধান পিয়া ব্রুনার এবং ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধান্ত মেহরা।

এ ছাড়া প্রতিনিধিদলে ছিলেন ইউএস চেম্বার অব কমার্সের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ডিরেক্টর প্যাট্রিক পিটস, ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক উদয়া অরুণ, ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের পরিচালক দেবী চ্যাটার্জি এবং ইউএস চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সিকিউরিটি কনসালটেন্ট শেমেই লেভি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন, ‘বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষ কোম্পানির কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন। এই কোম্পানিগুলো হচ্ছে- ইউএস বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, ইউএস চেম্বার অব কমার্স, এক্সিলারেট এনার্জি, শেভরন, মেটা বা ফেইসবুক, ভিএফ কর্পোরেশন, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল, মেট লাইভ, বোয়িং, উবার, অ্যাপেল, এশিয়া গ্রুপ, এপিআর এনার্জি, জিই ভারনুভা, ভিএফ কর্পোরেশন, করটিভা এগ্রি সায়েন্স, সেলফ সোর্স, ফুলকাসেমি, পাঠাও, সিসকো, রবার্ট, মেট্রো ট্র্যাক, এইচএসবিসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক, অ্যাংকর লেস এবং ড্রিংক ওয়েল।

‘ফলোপ্রসূ ও কার্যকরী আলোচনা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে স্বনির্ভর সমৃদ্ধ যে দেশ গড়তে যাচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসসূ আলোচনার মাধ্যমে আমরা সে দিকে ধাবিত হচ্ছি।’

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মেহেদুল ইসলাম এবং উপ-প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত