ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই

নিউরোসায়েন্সের নতুন ভবন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী
চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেরই শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ‘উন্নত হয় না’, রোগী মানসিক অবস্থা বুঝে তার সঙ্গে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো ‘বিকল্প নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এছাড়া প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য ও সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া জরুরি বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু প্রযুক্তি থাকলেই একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয় না। এর সঙ্গে মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই।’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল শনিবার সকালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সম্প্রসারিত ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি।

সেখানে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যের অধিকার শুধু মৌলিক অধিকারই নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতিরও চাবিকাঠি। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া জরুরি। ‘উন্নত চিকিৎসা যদি শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা বলা যায় না। সুতরাং, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।’

আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয় বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে চাই, আজ ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২ এর শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও একটি ধাপ এগিয়েছি।’

গতকাল শনিবার সকালে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন এই ভবনটির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল প্রাঙ্গনে একটি গাছের চারা লাগিয়েছেন।

২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর এই হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্নায়ুবিক জটিলতা যেমন স্ট্রোক, খিঁচুনি, পারকিনস’স রোহ, ডিমেনশিয়া, কিংবা মেরুদণ্ডের জটিল রোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ‘আমাদের দেশেও এ ধরনের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আজকের এই ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন উদ্বোধনের মাধ্যমে এ ধরণের রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

‘আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন ভবন শুধু রোগী ভর্তির ধারণক্ষমতাই বাড়াবে না বরং চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেএক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

জনগণের চিকিৎসা সেবার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ যেন স্বল্প খরচে বিশ্বমানের নিউরো চিকিৎসা পেতে পারেন, সেই লক্ষ্য নিয়েই এই বর্ধিত ভবন “নিউরোসায়েন্সেস-২” নির্মাণ করা হয়েছে।’

‘আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, অতিরিক্ত বেড এবং দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই ব্যবস্থা দেশের হাজারো রোগীর জন্য নিঃসন্দেহে আশার আলো বয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, রোগীর প্রতি একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিকিৎসকের প্রতি রোগী ও তার স্বজনদের আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টিও চিকিৎসাকে এগিয়ে নেয়।

চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা, রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝা এবং রোগীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসার মান অনেক বাড়িয়ে দেয়। আমাদেরকে এটিও মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা সেবা এবং চিকিৎসা পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতে সব দায় দায়িত্ব চিকিৎসকের একক নয়। বরং আমি মনে করি, চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন এই তিনটি পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সম্মান এবং সহানুভূতির সম্পর্ক থাকা বজায় থাকা জরুরি। ‘এই তিনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং সম্মানের পরিবর্তে চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন কিংবা রোগী এবং রোগীর স্বজনরা যদি চিকিৎসকদের উপর বিশ্বাস এবং মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন তাহলে আমরা যতই হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগীকে যাতে যেকোনো চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে না হয়ম সেদিকা দেখা হচ্ছে।

‘এজন্য সরকার ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে একদিকে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। ‘সুস্থ্য আগামী’ বিনির্মানের লক্ষ্যে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া সবার দায়িত্ব এবং কর্তব্য। ‘সেদিকে লক্ষ্য রেখে বর্তমান সরকার শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করছে। শিশু স্বাস্থ্যের প্রতিও সরকার বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করার কাজ শুরু করেছে। সরকার আগামী অক্টোবর মাসে একযোগে এই পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে এ যাবৎকালে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়ে বর্তমান সরকার প্রমাণ করেছে যে সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায়- এটি স্রেফ একটি স্লোগান নয়। বরং সরকার দেশে একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যাতে মানুষ দেশের ভেতরেই সব রকমের স্বাস্থ্যসেবা পায়। ‘তবে স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে সরকার যত উদ্যোগ গ্রহণ করুক চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকার উপরই স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার সাফল্য নির্ভর করবে। সরকার এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না, কিংবা কেউ অর্থাভাবে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। একজন সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান আপনাদের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব, এই প্রত্যাশা এবং বিশ্বাস রেখে আমি রাখতে চাই।’ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে সমাজ কল্যাণ ও শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত ও স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী : রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সম্প্রসারিত ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার সকালে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন এই ভবনটির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল প্রাঙ্গনে একটি গাছের চারা লাগিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নতুন ৫০০ শয্যা হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেছেন, সেগুলোর মধ্যে অপারেশন থিয়েটার ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটও আছে। এ সময় তিনি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও রোগীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নেন। সুজাউদ্দৌলা বলেন, ‘৫০০ শয্যার নতুন ভবন চালুর মধ্য দিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে নিউরোসায়েন্স সংক্রান্ত জটিল রোগের চিকিৎসায় এ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত