
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এমন পরিস্থিতিতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পে অর্থায়নে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিচ্ছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। এর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে এক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন দিচ্ছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকার ও আইডিবির মধ্যে এ অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশে আইডিবির কোনো একক প্রকল্পে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিনিয়োগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে চুক্তি সই হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন। চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের পক্ষে এর ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি স্বাক্ষর করেন।
এই প্রকল্পের আওতায় ইস্টার্ন রিফাইনারির বছরে আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে জানিয়ে উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইডিবি এর সদস্য দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কাজ করে থাকে। তিন দিনের সফরে বুধবার ঢাকায় এসেছেন ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আল জাসের। উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্ব, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। আগামী দিনে বাংলাদেশ ও আইএসডিবির মধ্যকার সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কী লাভ হবে?
ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তিকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সাবেক অন্তরর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি বলেছেন, ৫৪ বছরের অপেক্ষার পর ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তার মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণের পর ইস্টার্ন রিফাইনারির অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড) পরিশোধন ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন ক্রুড পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) প্রায় ৬৮ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করেছে। বিপরীতে দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা ছিল ১৫ লাখ টন। বাকিটা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পরিশোধিত অবস্থায় এসেছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়লে এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে ফয়েজ আহমদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ২০২৬ সালে ক্রুড জাহাজে করে আনার ক্ষেত্রে বাধার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ কারণে পরিশোধিত তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশয়াশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয় তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন গ্রেডের ক্রুড পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ইউরো-৫ মানের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ইউনিট-১ এর শান গ্রেডের ক্রুড পরিশোধন সক্ষমতা নাই। পরিশোধন, প্রক্রিয়াকরণ ও লজিস্টিকসের মূল্য সংযোজন এতদিন বিদেশে থেকে যাচ্ছিল। এসব ভ্যালু এডিশন দেশে হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফয়েজ আহমদ বলেন, প্রকল্পটির কাজ ২০১৫ সালে শুরু হলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প প্রস্তাব, ব্যয় সংশোধন, অর্থায়ন আলোচনা ও প্রশাসনিক বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এটি জাতীয় লজ্জার বিষয়। তিনি আরও জানান, সাবেক অন্তরর্বতী সরকারের সময়ে প্রকল্পটির কারিগরি স্পেসিফিকেশন চূড়ান্ত হয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। এরপর নির্বাচিত সরকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঋণ চুক্তি করেছে। এটিকে ইতিবাচক নজির হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
চলমান জ্বালানি সংকটে সরকার বদলালেই ফাইল আটকে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরুনোকে স্বাগত জানানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন ফয়েজ আহমদ। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কেন দ্বিতীয় বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শোধনাগার হলো না? এই প্রকল্প নিজেই প্রায় ১৬ বছর ধরে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয় সংশোধন, অর্থায়ন আলোচনা ও প্রশাসনিক বিলম্বের চক্রে ঘুরেছে। আমাদের সমস্যা দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়প্রক্রিয়ার অদক্ষতা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে, বন্দর রেল, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ জাতীয় সক্ষমতার অপরাপর প্রকল্প গুলোকে এরকম দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের করে আনতে হবে।
এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেন, 'এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যায় এবং সময়ক্ষেপণ করে ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ থাকে। আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্বাধীনভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়কে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই) হিসেবে নির্ধারণেরও প্রস্তাব দেন ফয়েজ আহমদ। একই সঙ্গে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি ইতিবাচক হলেও এটি কনসেশনাল বা স্বল্পসুবিধার ঋণ নয় উল্লেখ করে অর্থায়নের ব্যয়, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, প্রকল্পের রিটার্ন এবং প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ্যে থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
ফয়েজ আহমদের মতে, ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্প শুধু একটি শোধনাগার প্রকল্প নয়; এটি ডলার সাশ্রয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশে মূল্য সংযোজন এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়ন সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনে নয়, বরং রিফাইনারি চালু হয়ে উৎপাদন শুরু করার পরই প্রকল্পটির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।