ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অটোরিকশায় লাগবে কিউআর কোড ডিজিটাল ট্যাকিং

অটোরিকশায় বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি : সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অটোরিকশায় লাগবে কিউআর কোড ডিজিটাল ট্যাকিং

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও সরকারি রাজস্ব— সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। একইসঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও সংসদে জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 'নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে' নোটিশটি দেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪-এর সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।

নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখনও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া চলাচল করছে। এসব যানবাহনের নাম্বার প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরা যানবাহনের নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠায় এবং পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক নাম্বার প্লেটবিহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা যাচ্ছে না। নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, অটোরিকশা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাহনে পরিণত হয়েছে। ফলে একদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব যানবাহনের কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রধান সড়কে বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

তিনি অটোরিকশায় নাম্বার প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে এ খাত এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিপুলসংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনুমোদিত বা আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফর্মার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যানবাহনের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। তবে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে সরকারের ধারণা।

এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে জাতীয় গ্রিড এবং স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একইসঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ৩০০ অটোরিকশা: সংসদে নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে রেহানা আক্তার রানু বলেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি ঢাকায় প্রতিদিন আরও প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার দাবি, প্রতিদিন অটোরিকশার চার্জিং খাতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যা বর্তমানে লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিং করার কারণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।

তবে অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এসব যানবাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান।

রেহানা আক্তার রানুর প্রস্তাব— প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং ঢাকা শহরে অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা করা।

অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শুধু যানজট নয়, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

মন্ত্রী বলেন, অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড, পার্কিং ও যানসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ঢাকায় এসব যান যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে। অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে শিষাদূষণ, মাটি ও পানি দূষণ তৈরি হচ্ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও পোলট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ কারণে নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।

এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। অটোরিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নাম্বার প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত