ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাকস্বাধীনতা যেন 'বাকশালীনতার' সীমা লঙ্ঘন না করে

সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বাকস্বাধীনতা যেন 'বাকশালীনতার' সীমা লঙ্ঘন না করে

'গালাগালি সংস্কৃতির' বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি এ আহ্বান জানান। সরকারপ্রধান বলেন, 'ফ্যাসিবাদ শাসনকালে জনগণের সব গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বাকস্বাধীনতা। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক একটি পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।'

তারেক রহমান বলেন, 'আমরা যেরকম চাই না, দেশের জনগণের কাঁধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসুক, যেকোনো বিবেকবান মানুষ, যেকোনো দেশপ্রেমিক রাজনীতিক অবশ্যই আমরা চাই না, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত হয়। এজন্যই আমাদের সবাইকে দলমত নির্বিশেষে, আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, কেন আমরা জনপরিষদে সেসব শব্দ ব্যবহার করব? কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলোকে পরিহার করব না মাননীয় স্পিকার? আপনার মাধ্যমে আমি এটি সব সদস্যের কাছে, দেশের সব বিবেকবান নাগরিকের কাছে প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। 'আমরা যদি সত্যিকারভাবে সবাই এ ব্যাপারে একমত হই, আসুন আমরা তাহলে গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা গ্রহণ করি।' এ সময়ে সংসদ অধিবেশনের কক্ষে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সমর্থন জানান।

এদিন বিকাল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশন সমাপনীসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান। সমাপনীতে সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন। সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় গত ২৭ অগাস্ট।

'বিরোধ-বিভেদ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুরুজ্জীবিত করবে'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সরকারি দলই বলি, বিরোধী দলই বলি, আমরা সবাই মিলে আসুন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সে কারণে মাননীয় স্পিকার, সবসময় আমি বলার চেষ্টা করি, আমি বলে থাকি, 'সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ'। 'জনগণের কাছে আমার আহ্বান, আসুন গণতন্ত্র, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ, বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই হয়তো সুগম করতে পারে। এটি যেন আমরা ভুলে না যাই।' সরকারপ্রধান বলেন, 'ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই, শহিদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।' তিনি বলেন, 'গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা— আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। সারা পৃথিবীতেই সেটি থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। এটিও ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস। 'কিন্তু ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, মাননীয় স্পিকার, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।'

লং মার্চ দিয়ে বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় : জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সংকটময় এই মুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত লং মার্চ কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে উসকানি না দিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের পাশে থাকা উচিত। লং মার্চ দিয়ে সংকট সমাধান হলে সরকারি দল সবার আগে লং মার্চ করতো। এসময় বিরোধী দলকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি বিএনপি সরকারের অতীত সাফল্য ও সংকট জয়ের নজির তুলে ধরে দ্রুত বর্তমান পরিস্থিতি সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আজ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হতে যাচ্ছে। অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে। সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে তা তিনি দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সব সংসদ সদস্যের সদিচ্ছার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করার যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিগত ২৪-এর আন্দোলন পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন— তাদের স্বপ্ন পূরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ-এই বিশ্বাস থেকে তিনি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প কারখানা, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দুর্নীতির পাহাড় জমেছিল, যা বিরোধী দল ও গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সবার জানা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে কোনো অজুহাত হিসেবে না দাঁড় করিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

সাম্প্রতিক সময়কার তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করেনি। এমনকি বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস আহরণ করছিল, তখন এক অদৃশ্য ইশারায় বাংলাদেশের অংশ থেকে গ্যাস কূপ খনন করা থেকে বিরত থাকা হয়, যাতে বিশেষ কোনো দেশ লাভবান হতে পারে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যা তেল-গ্যাস আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে টার্মিনালটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে সংকট চরম আকার ধারণ করে।

জ্বালানি সংকটের এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলের বিশাল গাড়িবহর লং মার্চ কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে বা জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে কোনো অপচেষ্টা চালানো সমীচীন নয়। যদি গাড়ির লং মার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হতো, তবে সরকার নিজেই সবার আগে লং মার্চের আয়োজন করত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, ব্যাংকের সময় হ্রাস বা স্কুলে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার নামে কুইক রেন্টাল বসিয়ে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ও ঋণগ্রস্ত করেছিল, অথচ দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দেয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও কারিগরি দুর্যোগের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে উসকানিমূলক আচরণে রূপ দিলে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া ১৪০০ শহিদ ও ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষের ত্যাগ অবমূল্যায়িত হবে এবং পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র লাভবান হবে।

সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা এবং আশাবাদের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, এরইমধ্যে সরকার সংকট সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট দূর হবে। ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে একটি স্বাবলম্বী উৎপাদক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার বিশাল পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। অতীতের ঐতিহাসিক সাফল্যের নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই সংকট থেকে দেশকে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি'র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। তিনিই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিশাল জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পরবর্তী ১৯৯১ সালের সরকারের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তৎকালীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ও বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যার ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিকে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ভবিষ্যৎ উপহার দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত