
দেশজুড়ে বাড়ছে জ্বর, সর্দি-কাশি। অনেক পরিবারে একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন একাধিক সদস্য। কোথাও আবার পুরো পরিবারই জ্বর-সর্দিতে ভুগছে। এর মধ্যে কেউ কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে আবহাওয়ার ওঠানামার কারণে ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়ছে। ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত রফিকুল ইসলামের চার সদস্যের পরিবার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যরাও জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে তার ছোট মেয়ে ফাবিহা ইসলাম ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সবাই একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। একজন অসুস্থ হলে অন্যজন সেবা করতে পারেন। কিন্তু সবাই অসুস্থ হওয়ায় সেই সুযোগও ছিল না। তিনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় ছোট মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম ও শিক্ষিকা শায়লা আমীনের পরিবারেও একই চিত্র। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাদের পাঁচ সদস্যের পরিবার। প্রথমে ১২ বছর বয়সী বড় ছেলে জ্বরে আক্রান্ত হয়। এরপর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও জ্বর দেখা দেয়। এখন পরিবারের সবাই অসুস্থ। শায়লা আমীন বলেন, এই জ্বর তাদের জন্য কঠিন অভিজ্ঞতা। একজন অসুস্থ হলে অন্যরা সেবা করতে পারেন। কিন্তু সবাই একসঙ্গে অসুস্থ হওয়ায় কেউ কারও সেবা করার অবস্থায় নেই। এ কারণে গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজনকে আসতে হয়েছে।
সাংবাদিক ডি এম আমিরুল ইসলাম অমর এর ৪ বছরের ছেলে ডি এম আপন জ্বর, ঠান্ডা ও কাঁশিতে ভুগছে। সে বর্তমানে রাজধানীর কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। গত বুধবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডি এম অমরের পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্যও ঠান্ডা-জ্বরে ভুগছে। দুদিন আগে প্রচন্ড জ্বর থেকে সুস্থ হয়েছেন সাংবাদিক ডি এম অমরের মা। ডি এম অমরও ঠান্ডা কাশিঁতে ভুগছে।
চিকিৎসকদের মতে, ভাদ্র-আশ্বিনে আবহাওয়ার তাপমাত্রায় বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। দিনে তীব্র গরম ও রাতে বা ভোরে তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে পারে। এ সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও রাইনোভাইরাসসহ বিভিন্ন ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যায়। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বর, সর্দি-কাশির রোগী বাড়ছে।
মৌসুমি জ্বর-সর্দির পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বরের শুরুর দিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গের মধ্যে মিল থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কেউ কেউ সাধারণ জ্বর ভেবে পরীক্ষা না করিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। এতে পরে ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে জ্বর, সর্দি-কাশির রোগীর চাপ বেড়েছে। শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহাবুল হুদা চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু ও সাধারণ ভাইরাল জ্বরের পার্থক্য দ্রুত নির্ণয়ের জন্য জ্বর শুরুর প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত পরীক্ষা করা গেলে ডেঙ্গু শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ শুরু করা সম্ভব। তিনি বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার, জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সতর্ক থাকা, হাঁচি-কাশির সময় শিষ্টাচার মেনে চলা এবং নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ডাবের খোসা, ফুলের টব বা পলিথিনে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। রাতে মশারি ব্যবহার এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে অপচিকিৎসার আশ্রয় না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।